দেশে ডেঙ্গু মহামারি, বিএনপি করে কী?

রুমিন ফারহানা
৩ আগস্ট ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ০৭:০৫

দেশে ডেঙ্গু মহামারি, বিএনপি করে কী?

এক ছেলে তার বান্ধবীকে নিয়ে পার্কে বসে অন্তরঙ্গভাবে গল্প করছে। এমন সময় হঠাৎ ছেলের বাবা সেখানে হাজির, বিরাট মুশকিল! ছেলেটির হাতে এখন তিনটি উপায়—প্রথমত ছেলেটি ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারে অথবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কিংবা সে তার বাবার কাছে উল্টো জবাবদিহি চাইতে পারে, অফিস টাইমে তিনি পার্কে কী করছেন। ছেলেটি যদি যথেষ্ট ধূর্ত হয়, তাহলে সে নিঃসন্দেহে তৃতীয় অপশনটিই বেছে নেবে। গত কয়েকদিন যাবৎ নানা গণমাধ্যমের আলোচনা শুনে আমার বারবারই ধূর্ত বালকটির কথা মনে পড়েছে। কেন মনে পড়ছে সেই আলোচনায় পরে আসছি।

দেশে এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ বললেও কম বলা হয়। ইতোমধ্যে বিদেশি গণমাধ্যম একে মহামারি বলে আখ্যা দিয়েছে। প্রতিদিন দুই হাজারের ওপরে মানুষ ছুটে যাচ্ছে হাসপাতালে চিকিৎসার আশায়। সরকারি বা বেসরকারি কোথাও তিল ধারণের জায়গা নেই। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা মাত্র আট বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা এর মধ্যেই অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে। অথচ অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, দক্ষিণের নগরপিতা কিছুদিন আগেও একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুমিত সংখ্যাকে স্রেফ গুজবের বেশি কিছু বলতে নারাজ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তো সপরিবারে দেশত্যাগই করে বসলেন। পরিবারকে নিরাপদে মালয়েশিয়ায় রেখে তিনি ফিরে আসতে বাধ্য হলেও এই সংক্রান্ত প্রশ্নে সাংবাদিকদের প্রতি তার ক্ষুব্ধতা চাপা থাকেনি। যাই হোক, সাংবাদিকদের বোঝা উচিত ছিল, এই রাজতন্ত্রে উজির-নাজিরদের কাছে জবাব চাওয়া স্পর্ধার নামান্তর।

ডেঙ্গু যে আমাদের কত কী শেখালো। এই প্রথম আমরা জানতে পারলাম উত্তরে ওষুধ দিলে মশা উড়ে দক্ষিণে, আর দক্ষিণে দিলে যায় উত্তরে। আবার উত্তরের অকার্যকর ওষুধ মেয়রের দাবি মতে দিব্যি কাজ করে দক্ষিণে। আমরা ছা পোষা মানুষ মেয়রের ধমকে বাড়ির ভেতরে লার্ভা খুঁজতে বেরোলাম, কারণ ধরা পড়লে জরিমানা না দিয়ে ছাড় নেই। মেয়র মহোদয়রা বলুক বা না বলুক, লার্ভা খোঁজার দায়িত্ব নিশ্চিতভাবেই আমাদের। কারণ ভোগান্তিতে পড়ি আমরা, প্রাণ যায় আমাদের, দুশ্চিন্তায় অর্ধমৃত হই আমরা।

কিছুদিন আগে ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম দুই অনির্বাচিত, অদক্ষ, অযোগ্য, অসৎ মেয়র দিয়ে চলছে ঢাকা সিটি করপোরেশন। আজকে আমার লেখায় আরও দু’টো বিশেষণ যোগ করছি—এত বাচাল আর বেহায়া মেয়র বোধকরি বাংলাদেশের জন্মের পরে আর আসেনি। অনির্বাচিত বিষয়টি নিয়ে ‘পাঁড় মাতাল’ দলবাজ ছাড়া বিতর্ক কেউ তুলবে না। আর ইতোমধ্যে তারা তাদের অদক্ষতা, অযোগ্যতা যথেষ্ট যোগ্যতার সঙ্গে প্রমাণ করে ছেড়েছেন।

গত ৩১ জুলাই যুগান্তরে এসেছে মশা মারার অকার্যকর ওষুধের পেছনে আছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আর একই দিনের প্রথম আলো বলছে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে চলছে ওষুধ কেনাকাটা। তাদের রিপোর্টে উঠে এসেছে মশা মারার ওষুধ কেনায় নানা অনিয়মের তথ্য। মূলত দুই কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দুই সিটি করপোরেশন। মশা মারতে কামান দাগার নামে যে দুর্নীতি হয়েছে, ঢাকায় তার কিছুটা চিত্র পাওয়া যায় ২৯ জুলাই ২০১৯ তারিখের বাংলাদেশ প্রতিদিনের রিপোর্টে। পত্রিকাটি লিখেছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মশা নিধনে বরাদ্দ ছিল ১২.৫০ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মশা নিধনে বরাদ্দ ছিল ২৩.৪৫ কোটি টাকা। এর পরের অর্থবছরে এক লাফে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫.৬০ কোটি টাকা। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই সিটি মিলিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৪৬ কোটি টাকা। আর এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন চলতি অর্থবছরে ২৮ কোটি টাকার ওষুধ কেনার কথা ভাবছে। আইসিডিডিআরবি এবং সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি) স্পষ্টভাবে বলছে এই ওষুধ অকার্যকর। তারপরও এই অকার্যকর ওষুধ কিনে আসলে জনগণের করের টাকা জলে ফেলা হচ্ছে।

মশা মারতে কামান দাগা কথাটির সঙ্গে কে না পরিচিত? এই ‘অথর্ব’ সিটি করপোরেশনের বদৌলতে তারও চাক্ষুস প্রমাণ দেখলাম আমরা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য নানা পদক্ষেপ নিতে হাইকোর্ট একের পর এক রুল দিতে বাধ্য হলেন। শেষ অবধি বিষয়টি যথারীতি গড়ালো প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত।

সংখ্যা নিয়ে সরকারের নানান লুকোচুরি অসঙ্গতি আর বাচালতার মধ্যে বলে রাখি গত কয়েক বছরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা বলছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সব রোগী সরকারি নজরদারির মধ্যে নেই। চিকিৎসা নিতে আসা মাত্র ২ শতাংশ রোগী সরকারি নজরদারির মধ্যে পড়ে। ৯৮ শতাংশের কোনও তথ্য থাকে না। আবার আক্রান্তদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই চিকিৎসা নেয় না। এতে নয় দিন আগেই ডেঙ্গু আক্রান্তের অনুমিত সংখ্যা হয়েছিল সাড়ে তিন লাখ। এই অনুমিত হিসাব তৈরিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে সহায়তা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এমনকি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির কথা।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে রোগীর সংখ্যা, সরকারি এবং বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যার পার্থক্য, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা ও এ নিয়ে ভীতি ছড়িয়ে পড়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

আমার এত কথা বলার মূল উদ্দেশ্য হলো গত কয়েক দিনে টিভি টকশোগুলোতে ডেঙ্গু প্রসঙ্গে মূল যে আলোচনাটি উঠে এসেছে তার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ‘ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিএনপি কী করছে?’ পরিস্থিতি অনেকটা এরকম—এক নিঃসন্তান দম্পতির  সন্তান না হওয়ার দায় পাশের বাড়ির ভদ্রলোকের ঘাড়ে চাপানোর মতো।

এখন সংসদ অধিবেশন চলছে না, তাই ডেঙ্গু নিয়ে ভয়ঙ্কর ব্যর্থতায় বিরোধী দল বিএনপি টকশোতে সরকারকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে পারে, সরকারের যাবতীয় ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে জনগণকে দেখিয়ে দিতে পারে, এমন সম্ভাবনা মাথায় রেখেই টিভি চ্যানেলগুলোর টকশো’র সঞ্চালক, সরকারদলীয় নেতা এবং ‘বুদ্ধিজীবী’রা আমার শুরুতে বলা গল্পটির তৃতীয় অপশনটি গ্রহণ করেছে। ন্যূনতম মানবিকতা থাকলে এই যাচ্ছেতাই ব্যর্থতার মধ্যে তারা ওই গল্পের প্রথম দুই অপশনের মতো লজ্জায় পালিয়ে যেতো, কিংবা অপরাধ স্বীকার করে চুপচাপ থাকতো। কিন্তু তারা এতই ধূর্ত, তারা বিএনপিকে জিজ্ঞেস করছে, তারা কী করছে? তারা কি প্রত্যাশা করেন বিএনপি বিদেশ থেকে কার্যকর মশার ওষুধ আমদানি করে মশা মারার ফগার মেশিন নিয়ে মশা মারতে নেমে পড়বে? বিএনপি হাসপাতাল খুলে রোগীদের চিকিৎসা করবে?  

একটা শহরে মশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া, মানুষকে সবরকম ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সবকিছুই একমাত্র সরকারেরই দায়িত্ব। একটা বিরোধী দলের পক্ষে রোগটি নিয়ে মানুষকে সচেতন করা এবং কিছু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বাইরে তেমন কিছু করার সক্ষমতা থাকে না। সেই কাজ করছে বিএনপি—বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট বিতরণ, চিকিৎসা কর্মসূচি নিয়েছে তারা। বরং সরকার আর সব ক্ষেত্রের মতো এই কাজেও বিএনপির কাজে বাধা তৈরি করছে।

ঢাকা দক্ষিণে ডেঙ্গুর সচেতনতার র‍্যালিতে পুলিশি বাধা প্রমাণ করে সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করায় আদৌ আগ্রহী না।

বিরোধী দল হিসেবে মূল দায়িত্ব বিএনপি আন্তরিকভাবে পালন করছে। সভা করে, টিভি টকশো’র মাধ্যমে এই সংকটে সরকারের ব্যর্থতাগুলো নিয়ে কথা বলছে। একটা জনপ্রতিনিধিত্বশীল জবাবদিহিতামূলক সরকার থাকলে এসব সমালোচনা থেকে নিজেদের শুধরে নিতে তাদের কোনও সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। সেটা না করে সরকার তাদের মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের ‘চাটুকার’ বুদ্ধিজীবীরা বিরোধী দলকে দোষারোপের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিরোধী দলের সমালোচনায় সরকার ন্যূনতম ভ্রূক্ষেপ না করলেও এই চরম কর্তৃত্ববাদী সরকারের হুমকি উপেক্ষা করে জনগণের স্বার্থের পক্ষে কথা বলাটাও খুব বড় একটা কাজ।  

ডেঙ্গুর সিজনের এখনও তিন মাস বাকি; বিশেষজ্ঞরা বলেন এই রোগের প্রাদুর্ভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে। এর মধ্যেই দেশের সব জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ওদিকে দেশের অর্ধেকের বেশি জেলা বন্যাকবলিত। বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে নানারকম পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে সরকারের তেমন কোনও পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না। এরপর তার সঙ্গে ডেঙ্গু মহামারি যুক্ত হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে সেটা কল্পনাও করা যায় না। অথচ দেশের মানুষের এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে বিএনপি কী করছে, সেই আলোচনা করে সরকারি দল, টিভি চ্যানেলের সঞ্চালক এবং সরকারের অনেক ‘চাটুকার’ বুদ্ধিজীবী সময় পার করছেন। 

কিছুদিন আগে বিবিসি বাংলায় একটা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের পাশের ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা কতটা অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। ডেঙ্গু প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং সেখানে মৃতের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। একটা দেশের সরকার বা একটা শহরের মেয়র যদি মানুষের কাছে জবাবদিহিতার মূল্য দেন, তাহলে কী হতে পারে কলকাতা তার একটা চমৎকার উদাহরণ। আর মানুষের কাছে জবাবদিহিতা যদি একেবারেই মূল্যহীন হয় কোনও শহরের মেয়র বা ওই দেশের সরকারের কাছে তাহলে সেটার পরিণতি কী হতে পারে তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ এই মুহূর্তের ঢাকা এবং বাংলাদেশ।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য।

সংগৃহিত

ব্রেকিংনিউজ/ এসএ