ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতা

ফারুক আহমাদ আরিফ
৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ০২:৩২ আপডেট: ০২:৩৩

ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতা

সকালে কেউ যদি খালি পেটে মিষ্টি খায় তবে সারাদিন তার একটি ঢেকুর থাকে। এমনই কেউ ছোটকাল থেকেই ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করলে বড় হয়ে তার থেকে বিচ্যুৎ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। 

তিনি ছিলেন উদার চেতনার খাঁটি মুসলমান তার একটি প্রমাণ ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে প্রথম ভাষণে পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, তারা (পাকিস্তানিরা) আমাকে হত্যা করার জন্য কবর খুড়ে ছিল। আমি বলেছিলাম আমি মুসলমান, আমি বাঙালি, মুসলমান বার বার মরে না। আমাকে মেরে ফেললে লাশটা আমার বাঙালির কাছে পাঠিয়ে দিও। বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না।

পেছন ফিরে দেখলে আমরা পাবো বঙ্গবন্ধুর পূর্ব পুরুষ শেখ আউয়াল ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হযরত বায়জিদ বোস্তামী (র.) এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ভারতীয় উপমহাদেশে আসেন। পরবর্তীতে তারই উত্তরপুরুষেরা বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান শেখ আউয়ালের সপ্তম বংশধর। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান সুফি চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু কখনও ইসলাম বা অন্য ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেননি। বাংলাদেশকে সকল ধর্মের মানুষের জন্য শান্তির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তার শাসনামলে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে যে অসামান্য অবদান রেখেছেন তা মুসলিম বিশ্বে বিরল। কলকাতায় পড়ালেখা করার সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ধর্মীয় গোড়ামীর ফলাফল। সেখানকার দাঙ্গা-হাঙ্গামা।

ইসালামিক শিক্ষা প্রচার-প্রসারে বঙ্গবন্ধু: ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের পাশাপাশি সহিহ ইসলাম প্রচার, প্রসার এবং গবেষণার জন্য ‘বাইতুল মোকাররম সোসাইটি’ ও ‘ইসলামিক একাডেমি’কে একীভূত করে বৃহত্তর পরিসরে ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ মহামান্য রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অধ্যাদেশবলে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে ২৮ মার্চ ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন অ্যাক্ট’ প্রবর্তিত করেন। 

তিনি ‘ইসলামিক একাডেমি’ ও ‘বাইতুল মোকাররম সোসাইটি’র নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ নামকরণ করেন। এটি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ১৯৪৭ সালের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষে পাকিস্তান ও ভারত প্রতিষ্ঠা। যার ফলে দু’দেশে দাঙ্গাহাঙামা লেগেই আছে। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ভূমি হারিয়ে অসহায়ভাবে কত মুসলমান-হিন্দু পথে পথে ঘুরছে তার কোনো ইয়াত্তা নেই। 

কুরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন পাস হবে না: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তান বেতার ও টেলিভিশনে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমার কথা সুস্পষ্ট, আমরা লেবাস সর্বস্ব ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) -এর ইসলাম, যে ইসলাম জগতবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বার বার যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধে। যে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান সে দেশে ইসলামবিরোধী আইন পাসের কথা ভাবতে পারেন তারাই, ইসলামকে যারা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা ফারস্থা করে তোলার কাজে।’

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়: ১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর খসড়া সংবিধানের ওপর আলোচনার জন্য আয়োজিত সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম-কর্ম করার স্ব-স্ব অধিকার অব্যাহত থাকবে। আমরা আইন করে ধর্ম চর্চা বন্ধ করতে চাই না এবং তা করবও না। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের কারও নেই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম-কর্ম পালন করবে, কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না। আমাদের আপত্তি হলো ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

বঙ্গবন্ধু দিকনির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় সীরাত মজলিশ প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। সীরাত মজলিশ ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে রবিউল আউয়াল মাসে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বৃহত্তর আঙ্গিকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) মাহফিল উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করলে সরকারপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু বায়তুল মোকাররম মসজিদ চত্বরে মাহফিলের শুভ উদ্বোধন করেন।

পবিত্র কুরআনের বাংলা তরজমা, তাফসির, হাদিস গ্রন্থের অনুবাদ, রাসূল (সাঃ)-এর জীবন ও কর্মের উপর রচিত ও অনূদিত গ্রন্থ, ইসলামের ইতিহাস, ইসলামী আইন ও দর্শন, ইসলামী অর্থনীতি, সমাজনীতি, সাহাবী ও মনীষীগণের জীবনী ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন অ্যাক্টে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয় তা হচ্ছে:

(ক) মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র, একাডেমি ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা।
(খ)মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র, একাডেমি ও ইনস্টিটিউট এবং সমাজ সেবায় নিবেদিত সংগঠনসমূহকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া।
(গ) সংস্কৃতি, চিন্তা, বিজ্ঞান ও সভ্যতার ক্ষেত্রে ইসলামের অবদানের ওপর গবেষণা পরিচালনা।
(ঘ) ইসলামের মৌলিক আদর্শ বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, ন্যায় বিচার প্রভৃতি প্রচার করা ও প্রচারের কাজে সহায়তা করা এবং সাংস্কৃতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ এর সুপারিশ করা।
(ঙ) ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিমালা জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, আয় ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত গবেষণার আয়োজন করা ও তা প্রসার ঘটানো এবং জনপ্রিয় ইসলামি সাহিত্য সুলভে প্রকাশ করা এবং সেগুলির সুলভ প্রকাশনা ও বিলি-বণ্ঠনকে উৎসাহিত করা।
(চ) ইসলাম ও ইসলামের বিষয় সম্পর্কিত বই-পুস্তক, সাময়িকী ও প্রচার পুস্তিকা অনুবাদ করা, সংকলন করা ও প্রকাশ করা।
(ছ) ইসলামের ইতিহাস ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, আয় ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিষয়াদির ওপর সম্মেলন, বক্তৃতা, বিতর্ক ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা।
(জ) ইসলামবিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য পুরষ্কার ও পদক প্রবর্তন করা।
(ঝ) ইসলাম সম্পর্কিত প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া, প্রকল্প গ্রহণ করা কিংবা তাতে সহায়তা করা।
(ঞ) ইসলামবিষয়ক গবেষণার জন্য বৃত্তি প্রদান করা।
(ট) বায়তুল মুকারাম মসজিদের ব্যবস্থাপনা ও উন্নতি সাধন করা।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন

মাদরাসা শিক্ষাব বোর্ড পুনর্গঠন: ইসলামী আকিদাভিত্তিক জীবন গঠন ও দ্বীনিশিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন করেন। পূর্বে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড স্বায়ত্ত শাসিত ছিল না। বঙ্গবন্ধুই প্রথম মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডকে স্বায়ত্ত শাসন প্রদান করে এর নাম রাখেন ‘বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড।’ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধ প্রসারের এক মাইলফলক। জাগতিক শিক্ষার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকীকরণের পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চতর শিক্ষার দ্বার উন্মুক্তকরণ এবং মাদ্রাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সরকারী চাকরির নিশ্চয়তা ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করেছিলেন।

বিশ্ব ইজতেমা শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে সর্বপ্রথম স্থায়ী বন্দোবস্ত হিসেবে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরবর্তী জায়গাটি প্রদান করেন। এছাড়া তাবলিগ জামাতের কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদের সম্প্রসারণের দরকার হলে তখন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নির্দ্বিধায় সরকারি জায়গা বরাদ্দ  দেন।

হজ পালনের জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা: পাকিস্তান আমলে হজযাত্রীদের জন্য কোনো সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা ছিল না। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রথম হজযাত্রীদের জন্য সরকারি তহবিল থেকে অনুদানের ব্যবস্থা করেন।  

সীরাত মজলিশ প্রতিষ্ঠা: বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় সীরাত মজলিশ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়। সীরাত মজলিশ ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে রবিউল আউয়াল মাসে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বৃহত্তর আঙ্গিকে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) মাহফিল উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। সরকারপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু বায়তুল মোকাররম মসজিদ চত্বরে মাহফিলের শুভ উদ্বোধন করেছিলেন। আজ অবধি তা চলমান।

বেতার-টেলিভিশনে ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার: বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে তারই নির্দেশে সর্বপ্রথম বেতার ও টেলিভিশনে গুরুত্বের সঙ্গে পবিত্র কোরআন ও তার তাফসীর এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার করার সুব্যবস্থা করেন।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ), শবেকদর, শবেবরাত উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি ঘোষণা: ধর্মীয় দিবসসমূহ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাংলাদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন এবং উল্লিখিত দিবসসমূহের পবিত্রতা রক্ষার্থে সিনেমা হল বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেন।

মদ জুয়া নিষিদ্ধকরণ ও শাস্তির বিধান: ইসলামে মদ জুয়া সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ইসলামের এই বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারীভাবে আইন করে এসব অপকর্ম নিষিদ্ধ করেন।

এসব কার্যক্রমের মাধ্যমেই বুঝা যায় ইসলামী তথা ধর্মীয় শিক্ষা প্রচার-প্রসারে তিনি ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

লেখক: আহ্বায়ক- মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস ও মুখপাত্র (প্রধান সমন্বয়ক) নো ভ্যাট অন এডুকেশন।

২ সেপ্টেম্বর-২০১৯, ১০৬ লেক সার্কাস, কলাবাগান (ধানমন্ডি), ঢাকা-১২০৫


ব্রেকিংনিউজ/এসএসআর