নো ভ্যাট অন এডুকেশন: বিশ্বে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রথম বীজ

ফারুক আহমাদ আরিফ
১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
প্রকাশিত: ১১:০৮

নো ভ্যাট অন এডুকেশন: বিশ্বে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রথম বীজ

মানুষের জন্মই একটি আন্দোলন। তাকে অনেকগুলো পর্যায় অতিক্রম করে একটি প্রাণিতে পরিণত হতে হয়। অবশ্য এই আন্দোলনের ক্রমধারায় মানুষের হাত নেই, সম্পূর্ণ মহান সৃষ্টিকর্তার কার্যক্রম। সেদিকে না গিয়ে আমাদের আলোচ্যবিষয় 'নো ভ্যাট অন এডুকেশন' আন্দোলনের নতুন দিগন্তের সূচনা তথা বিশ্বে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রথম বীজ।

‘২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের যাবতীয় লেনদেনের উপর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১০ শতাংশ ভ্যালু এডেড টেক্স (ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব করে।

পরবর্তীতে ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শে সেটি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ধার্য করে অর্থবিল ২০১৫-১৬ জাতীয় সংসদে পাস হয় এবং প্রজ্ঞাপন জারিই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট। 

আমরা শিক্ষার্থী সমাজ ৭ জুন থেকে শিক্ষাখাতে ভ্যাট প্রত্যাহারে আন্দোলন শুরু করি। অবশ্য আন্দোলনের সূচনা ১৪ মে আরিফ চৌধুরী শুভ'র গণমাধ্যমে চিঠি প্রেরণের মাধ্যমে। কেউ স্ব-উদ্যোগে, কেউ সাংগঠনিকভাবে, কেউবা বিবেকতাড়িত হয়ে নানাভাবে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। এই ৭.৫০ শতাংশ ভ্যাট সব শিক্ষার্থী দিতে পারবে না বিষয়টি এমন ছিল না বরং শিক্ষাকে বাণিজ্যিক পণ্যের হাত থেকে রক্ষা করতেই আন্দোলন।

যদিও শিক্ষার্থীদের বিশাল অংশের জন্য ৭.৫০ শতাংশ ভ্যাটের অর্থপ্রদান ছিল দুরুহ এবং সাধ্যাতীত। এটি শিক্ষাজীবন ধ্বংসের প্রথম স্ফুলিঙ্গ। যেটি শুধু বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থী নয় বরং বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য হুমকি ও মরণফাঁদের সূচনা সঙ্গীত।

কেননা সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৬ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবন যাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতীকরণের ব্যবস্থা, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে আমূল রুপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র: (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য, (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য, (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। অর্থাৎ সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে তুলে আনা হয়েছে। শিক্ষা হচ্ছে মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রকেই তা নিশ্চিত করতে হবে। অথচ রাষ্ট্র তা না করে বরং শিক্ষাব্যবস্থাকে বেসরকারি হাতে ইজারা দেয়া হয়েছে।

৩০ জুন ইউল্যাবের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহান হাবিবকে প্রধান সমন্বয়ক করে ধানমন্ডিতে 'নো ভ্যাট অন এডুকেশন' প্লাটফর্মের যাত্রা শুরু। ১৬ আগস্ট তিনি আন্দোলন ছেড়ে চলে গেলে সেইদিন সন্ধ্যা হতে সমন্বয়করা আমাকে প্রধান সমন্বয়ক নির্বাচন করে। তবে প্রধান সমন্বয়ক শব্দটি ব্যবহার না করে সেটিকে মুখপাত্র এবং অন্যান্য সমন্বয়কদের সংগঠক বলে অভিহিত করার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রাচীনকাল থেকেই একটি কথা মানুষের মগজে গেঁথে ছিল যে, আন্দোলন অর্থই হচ্ছে হাঙ্গামা-ভাংচুর, রক্তঝরা, প্রাণদান। আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে চেয়েছিলাম। সেই মোতাবেক কাজও করতে হয়েছে। বিষয়টি মোটেও সহজ ছিল না।

আগুনের উপর দিয়ে নিরাপদে হেঁটে যাওয়া যতটা অসাধ্য তার চেয়েও কঠিন বাস্তবতা ছিল আন্দোলন শান্তিপূর্ণ রাখা। কেননা তখন বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ ছিল উত্তপ্ত। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিকদলগুলো দাঙ্গা, হাঙ্গামা, পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, অরাজকতা সৃষ্টি, শিক্ষকসমাজ বেতন স্কেল নিয়ে ক্লাস বিরতি দিয়ে আন্দোলন, রাষ্ট্রীয় মদদে গুম, খুনসহ দেশের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত!

বিশ্বরাজনীতিও সুখকর ছিল না। বিশ্বের নানা প্রান্তেই ন্যায্য অধিকার আদায়ে আন্দোলনরতদের উপর নির্যাতন, নিষ্পেষণ চলছিল। বাধ্য হয়ে আন্দোলনের ভাষা হয় সেই চিরচেনা সংঘর্ষ।

আমরা এই পথ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে মনযোগ দিলাম। সুতা ছিড়ে যাওয়া তসবিহ দানা ধরে রাখা যতটা অসাধ্য তার চেয়েও কর্মীদের শান্তিপূর্ণ রাথা ছিল কঠিন। কেননা আন্দোলন অর্থই সবাই জানত, মানত, করত যে গাড়ী-বাড়ী ভাঙ্গা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ক্ষতিসাধন, মানুষকে জিম্মি করা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো ইত্যাদি।

আমরা শান্তিপূর্ণ থাকলেও রাষ্ট্র আমাদের প্রতি শান্তিদায়ক ছিল না। ২৯ জুন গ্রেফতার, লাঠিচার্জ, ২২ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া, ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ভবনে স্মালকলিপি দেয়ার কর্মসূচিতে কাঁটাতারের বেরিকেড, ১৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পদযাত্রায় রক্তঝরানো, যুদ্ধেংদেহি অবস্থান, কাঁটাতারের বেরিকেড, ৯ সেপ্টেম্বর ইস্ট ওয়েস্টের মানববন্ধনে পুলিশের গুলি করাসহ প্রতিটি পদে আমাদেরকে আক্রমণ, নির্যাতন, নিষ্পেষণ করে ধ্বংস করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এই প্রতিকূল অবস্থায় থেকেও আমরা সাংঘর্ষিক পথে না গিয়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখি।

যে ব্যক্তি কোন একটি খেলার অধিনায়কত্ব করেছেন তিনিই বুঝেন প্রতিটি খেলোয়াড়কে শান্তিপূর্ণ রেখে তার কাছ থেকে কাজ আদায় করা কতটা কঠিন, গলদঘর্ম। যাই হোক সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণ রাখা সম্ভব হয়। ১০ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫দিন সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে জায়গায় সড়ক অবরুদ্ধ করে শুধু স্লোগান দিয়ে আন্দোলন করতে থাকি ভ্যাট প্রত্যারের দাবিতে।

১৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দেন আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলো, শিক্ষাখাতে কোন ভ্যাট দিতে হবে না। যোহরের আজানের সময় সিদ্ধান্তের এই খবরটি আমাদের আনন্দিত করে তোলে। আমরা রাজপথ ছেড়ে ক্লাসে ফিরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে।

দীর্ঘ সাড়ে ৪ মাসের দু:খ, কষ্ট, ব্যথা, গ্লানি নিমিষেই আনন্দের হিল্লোলে ভরে উঠে। এই প্রথম বিশ্বের কোন ছাত্র আন্দোলন হলো শান্তিপূর্ণভাবে। উন্নয়নশীল দেশে তো নয়ই বরং উন্নত দেশগুলোতেও এর আগে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হয়নি। এটিই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের শুরু।

তারপর শ্রীলঙ্কা, গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশে শিক্ষাখাতে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। সেখানে তারা নো ভ্যাট অন এডুকেশন নামেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। বিশ্বের নানাপ্রান্তে শিক্ষার্থীরাসহ সাধারণ মানুষ নানান ন্যায্য দাবির অধিকার আদায়ে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছে। তবে কোথাও কোথাও সাংঘর্ষিক রুপও লাভ করেছে।

বাংলাদেশে কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক চাই নামেও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হয়েছে। স্টেট ইউনিভার্সিটির বাশার, মারুফ, সকাল, অনির্বাণ, যুমানা, তানভীর, মাহি, সাহাব, জুয়েল, তুষার, ইউআউইউ’র মাহফুজুর রহমান নাঈম, মেজবাহ, আতিক, স্টামফোর্ডের আরিফ চৌধুরী শুভ, জ্যোতির্ময়, সজীব, ইউল্যাবের ফারহান হাবিব, জাহিন, গগণ, ডেফোডিলের আয়াজ খান, বনানীর তানিম, অনি, সজীব, ইস্ট ওয়েস্টের অপু, কাকন, সানী, ইউআইটিএসে অনি, উজ্জ্বল, চট্টগ্রামে এস এম রায়হান ওয়াজেদ চৌধুরী, শিমুল গুপ্ত, আলিনুর, আকাশ, রাজশাহীতে তামিম, জুয়েল, সিলেটের মিজান, দেবপ্রিয় পাল, ফাহিম, সাকিব, আশফাকুর রহমান তামিম, ইয়ামিন বক্স, নকিব চৌধুরী, বেলায়েত খাঁন, দেবাশিষ দেব, রেদওয়ান আহমেদ, আতিক রহমান, মেহেদী সেতু, মাইদুল আলম সিদ্দিক বাপ্পি, সুস্মিতা রয় প্রপা, জীবন তালুকদার, পাইলট মিজান, জনি, ইথার, শুভ, ইভা, তাসমিয়া তাবাসসুম ইশা, সৈয়দা তানিয়া, ইফতেকার, রবিন, সুমন, তানিম, নাজমুল, রনির উত্তরায় সাকলাইন, সৌরভ, আশিকুর, অনিক, মেহেদী, শাওন, বাতেন, সুমন, অরুনাক, আশার সাদ্দাম, ব্র্যাকের অনি, রেজওয়ান, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের পলাশ, মাহফুজা, কৌশিকের কেন্দ্রীয় দক্ষ নেতৃত্ব। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষানুরাগী, বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যমব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ দেশের সকল প্রকার সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ও সমর্থনে আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে।

আজ ১৪ সেপ্টেম্বর ভ্যাটমুক্ত শিক্ষা দিবস ও আন্দোলনের ৪র্থ বছরপূর্তি। আন্দোলনের ফলে যারা কষ্ট স্বীকার করেছে সকলের প্রতি অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

লেখক: মুখপাত্র (প্রধান সমন্বয়ক) নো ভ্যাট অন এডুকেশন