মাহমুদ মাদানী এবং একটি পর্যালোচনা

মাওলানা মো: সাইফুল ইসলাম
১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার
প্রকাশিত: ০৩:১৬ আপডেট: ০৩:১৮

মাহমুদ মাদানী এবং একটি পর্যালোচনা

সম্প্রতি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মুখপাত্র ও দলীয় সেক্রেটারি মাওলানা মাহমুদ মাদানীর, কাশ্মির বিষয়ক এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তুমুল আলোচনা- সমালোচনা হচ্ছে। 

১২ সেপ্টেম্বর'১৯, রোজ বৃহস্পতিবার, রাত ১০ টায় নয়া দিল্লিতে আরএসএস সভাপতি মোহন ভাগবতের সাথে রুদ্ধদ্বার দীর্ঘ ৯০ মিনিটের বৈঠকের পর অপেক্ষমান সাংবাদিকের সাথে চলমান কাশ্মির সংকট নিয়ে জমিয়ত নেতা মাওলানা মাহমুদ মাদানী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মত। উনার বক্তব্যের বিষাক্ত তীরের আঘাতে মুসলিম হৃদয়ে বেদনার রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে, যার পরিমাণ কাশ্মিরী শহিদদের রক্তের চেয়েও অনেক বেশি। কেননা কাশ্মিরে দীর্ঘ ৭২ বছরে ভারতীয় দখলদার বাহিনীর নগ্ন হামলায় যত জন মুসলিম শাহাদাত বরণ করেছেন, মাদানী সাহেবের বক্তব্যে ব্যথিত হয়েছে তার চেয়েও লক্ষগুণ বেশি মুসলমান। নয়া দিল্লিতে অবস্হিত আরএসএস কার্যালয় ‘কেশবকুঞ্জে’ মোহন ভাগবতের সাথে মাহমুদ মাদানীর রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের নিকট বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রেস ব্রিফ করেন। 

বলে রাখি, ১৯৯২ সালে ভারতের অযোধ্যায় অবস্থিত “বাবরী মসজিদ” ধ্বংসসহ ভারতে যতগুলো মুসলিম জাতিগত নিধন দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছে, তার সবগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছে- এই মোহন ভাগবতের উগ্র হিন্দু জঙ্গি সংগঠন  “আরএসএস”। বাবরী মসজিদ ভাংগার সময় মোহন ভাগবত আরএসএস এর কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী নেতা ছিল।

মাহমুদ মাদানী তার প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন - ‌‘কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছিন্ন অংশ’। এই উক্তিটি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মিথ্যাচার গুলোর মধ্যে অন্যতম। সারা দুনিয়ার সচেতন মানুষ জানে, ১৯৪৭ সালের ২৪ অক্টোবর ভারতীয় সেনাবাহিনী ভূস্বর্গ কাশ্মিরে অনুপ্রবেশ করে জোরপূর্বক ভাবে জবর দখল করে রেখেছে। অথচ মাহমুদ মাদানি নিকট অতীতের এই অমোঘ সত্য ইতিহাসকে মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে ঢাকার বৃথা চেষ্টা করলেন।

তিনি আরো বলেন ‘নিরাপত্তা ও অখন্ডতার প্রশ্নে কোনো আপোষ নয়। বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে ভারত বদ্ধপরিকর’। মাহমুদ সাহেব -কাশ্মির স্বাধীনতা  যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে তাদেরকে যে কোনো মূল্যে দমন-পীড়ন চালাতে ভারতীয় জালেম বাহিনীকে উস্কে দিয়ে জুলুমের পক্ষে সাফাই গাইলেন। বদর, ওহুদ, খন্দক ও বালাকোটের উদীপ্ত চেতনা ধারণ করে, যে সকল কাশ্মিরী মুসলমান শাহাদাত বরণ করেছেন,  মাহমুদ মাদানী সাহেব প্রত্যক্ষভাবে সেই সকল বীর শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি ও গাদ্দারী করেছেন।

ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা সংবলিত ৩৭০ ধারা বাতিলের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মাদানি বলেন- ‘৩৭০ ধারা বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরী জনগণের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে’। কিভাবে অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে কিছু বলেন নি। অথচ ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রত্যক্ষ ফলাফল হল, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কাশ্মিরে মুসলমানগণ সংখ্যাগুরু থেকে অতি নগণ্য সংখ্যালগুতে পরিণত হবে। এখন কাশ্মিরে হিন্দুদের অভিবাসী করতে আর কোনো বাধ্য -বাধকতা থাকল না।

বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতী রায় সর্বদাই কাশ্মিরে ভারতীয় বাহিনীর মানবাধিকার লংঘনের বিষয়ে সোচ্চার। তিনি কাশ্মিরী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পক্ষে কথা বলে বহু বছর যাবৎ ভারত সরকারের বিরাগভাজন। 
আর এত বড় ইসলামিক স্কলার হওয়া সত্বেও মাহমুদ মাদানী সাহেব কাশ্মিরী মুজাহিদদের সমর্থন তো করলেনই না, বরং তাদের দমন করার ভারতীয় বাহিনীর কুখ্যাত নীতিকে সমর্থন করলেন।

আসামে এনআরসি এর যাতাকলে পিষ্ট ১৯ লাখ (প্রায় সবাই মুসলমান) বাস্তুুচ্যূত লোকের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মাহমুদ মাদানী বলেন- ‘শুধু আসামে কেন? সমগ্র ভারতেই এনআরসি করে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা প্রস্তুত করা হোক’। 
কি মারাত্মক কথা! ১৯৪৭ সালে আসামের মুসলমানগণ জমিয়তের এক জাতিতত্ত্বের আহ্বানে সাড়া দিয়ে, পাকিস্তানের বিপক্ষে গিয়ে হিন্দুস্তানের পক্ষে ভোট দিয়ে ভারতের অংগরাজ্যে পরিণত হয়। সেই মুসলমানদের মহা বিপদ মুহুর্তে তাদের পক্ষে কথা না বলে, আরো একধাপ এগিয়ে সমগ্র ভারতে এনআরসি করে মুসলমানদের তাড়ানোর নীতিকে সমর্থন করলেন!
অথচ পশ্চিম বঙ্গের মূখ্য মন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এক জন হিন্দু মহিলা হওয়া সত্বেও এনআরসির বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ, সাহসী ও সময়োপযোগী বক্তব্য দিয়েছেন তা এই জাতীয় মাদানীদের চপেটাঘাত কারার মত।

১২ সেপ্টেম্বর, কলকাতার রাজপথে মমতা ব্যানার্জী এনআরসির বিরুদ্ধে মিছিলোত্তর বক্তব্যে নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে বলেন- ‘আগুন নিয়ে খেলবেন না। আরেকটা বঙ্গভঙ্গ করার চেষ্টা করবেন না। বাংলাকে আসাম মনে করবেন না। বাংলা কখনো মাথা নত করে না’। 

বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ সম্প্রতি এনআরসি করে পশ্চিম বঙ্গ হতে ২ কোটি লোক বের করে দেয়ার হুমকিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মমতা বলেন- ‘২ কোটি কেন? সাহস থাকে মাত্র ২ জন লোককে বাদ দিয়ে দেখুক!! আমি মরে গেলেও বাংলায় এনআরসি করতে দেব না’। 
একজন মহিলার এরকম যৌক্তিক কথার প্রসংশা করতেই হয়।
 
এত কিছুর পরও বাংলাদেশের কতিপয় অন্ধ মাহমুদ মাদানী ভক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদানির বক্তব্যের পক্ষে ওকালতি করতে দেখা যায়। যা বড়ই আফসোসের বিষয়!! 
মহান আল্লাহ সকলকে সত্য- মিথ্যা পার্থক্য বুঝার তাওফিক দান করুক। আমীন।

প্রভাষক, রাজঘাট ফাযিল মাদ্রাসা, ফুলবাড়িয়া- ময়মনসিংহ

ব্রেকিংনিউজ/এসএসআর