মিডিয়ার গন্তব্য ম্যাজিক বুলেট নাকি গুজব বুলেট!

মুসা বিন মোহাম্মদ
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
প্রকাশিত: ০৫:৪৬

মিডিয়ার গন্তব্য ম্যাজিক বুলেট নাকি গুজব বুলেট!

মিডিয়া পেশা দু-চারটি পেশার মতো নয়। একে কেবল অফিস, ডিউটি ও মাসিক বেতন দিয়ে মূল্যায়ন করা এ পেশার অসম্পূর্ণ সংজ্ঞায়ন। সরকারি-বেসরকারি গতানুগতিক অন্য সব পেশার জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা থাকে একক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হাতে। দৃশ্যত এখানে যাবতীয় বাহ্যিক ও আর্থিক সুযোগ সুবিধা দিয়েই এ পেশার মান নির্ধারক ও নির্ণায়ক বলে মনে করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে পেশাদারিত্বের পাশাপাশি মিডিয়া পেশার আরেক মৌলিক পরিচয় অনেকের অজ্ঞাত। মিডিয়া তাত্ত্বিকদের মতে, গণমাধ্যমকে বলা হয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ফোরথ স্টেট বা চতুর্থ স্তম্ভ। রাষ্ট্রের ‘ওয়াচ ডগ’ (অতন্ত্র প্রহরী) হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম পেশায় নিয়োজিত পেশাদার দায়িত্ববান সৎ সংবাদকর্মীরা। অত্যন্ত বিশ্বস্ত, আস্থাভাজন ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে তথ্য ও সংবাদ প্রবাহের জন্য রাষ্ট্রের মালিক জনগণের জন্য মিডিয়ার ভূমিকা ‘ম্যাজিক বুলেট’ বা জাদুর টোটার মতো।

জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে জাদুর মতো কাজ করে গণমাধ্যম। সাংবাদিকতার সব ইথিকস বা নৈতিকতা মেনে তথ্যের যোগান নিশ্চিত করলে জনমনে মিডিয়ার‘ম্যাজিক বুলেট’ প্রভাব কাজ করবে। অন্যথায় তাদের বিশ্বাস আর নৈতিকায় ভাটা পড়বে। পাশাপাশি ইতিবাচক জনমত গঠনে মিডিয়ার গন্তব্য হবে ‘ম্যাজিক বুলেট’ থেকে ‘গুজব বুলেটে।’ ফলে দেশে সংঘটিত যেকোনো ঘটনার খবর অতি সহজে গ্রহণ করবে না। অহেতুক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদকে গুজব বলে উড়িয়ে দিবে। গণমাধ্যম তার প্রকৃত দায়বদ্ধতা থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়াটাই মূলত মূল কারণ।

আমাদের মতো এই ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ‘ওয়াচডগের’ ব্যানারে গণহারে মিডিয়ার মালিক বনে যাচ্ছে অপেশাদার মুনাফাভোগী ব্যক্তিরা। এসব মিডিয়ার পলিটিক্যাল ইকোনোমি বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যমের কর্ণধার রাজনীতিক, ব্যবসায়িক, সুনির্দিষ্ট মতবাদে বিশ্বাসী। তারা নিজস্ব মতবাদ, দর্শন, স্বার্থ উদ্ধারে নীতিচ্যূত হয়ে নিয়ন্ত্রণাধীন মিডিয়াকে ব্যবহার করছে। পেশাদার সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াদের মালিকানায় গণমাধ্যম না থাকার দরুণ ওয়েজ বোর্ড নিয়ে মালিক ও সংবাদকর্মীরা মুখোমুখি হয়েছেন। দায়িত্ববোধের চেয়ে বেতন কাঠামোকে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে ব্যবসায়িক মিডিয়া মালিক পক্ষ। এ কারণে ইথিকস অব জার্নালিজমকে তোয়াক্কা না করে অপেশাদারদের মিডিয়ায় অবাধে অনুপ্রেবেশ ঘটছে। জনগণের তথ্য চাহিদা পূরণের নাম করে ক্ষমতাবানদের সভাকবির দায়িত্ব পালন করছে অধিকাংশ গণমাধ্যমরা। ফোরথ স্টেটের নামে এসব গণমাধ্যম আর ক্ষমতাবানরা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ফলে সংবাদের ইতিবাচক ‘ম্যাজিক বুলেটের’ প্রভাব থেকে অধিকাংশ গণমাধ্যম গুজবের বুলেটে পরিণত হয়েছে।

ক্রসফায়ার আর ডেঙ্গু জ্বরে অজ্ঞাত সোর্সের বরাতে গুজব নিউজ প্রকাশ করায় গণমানুষের অতি বিশ্বাস নিঃশেষ হয়ে গণমাধ্যম ক্রমেই গুজবের মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে। জার্মানীর নাৎসী বাহিনীর প্রধান অ্যাডলফ হিটলারের গুজবের মন্ত্রী হিসেবে পরিচিত তথ্যমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস বলেছেন, একটি তেলের বা গ্যাসের ট্যাংকার বিস্ফোরণে কয়েকশ লোকের প্রাণহানি ঘটতে পারে। কিন্তু ‘একটি পরিকল্পিত মিথ্যা তথ্য মুহূর্তেই একটি জাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। দেশ ও মানুষের  বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের ম্যাজিক ধরে রাখতে পেশাদার মালিকের হাতে মিডিয়া তুলে দিতে হবে। নচেৎ গুজবের গুরুদের হাত ধরে গণমাধ্যম হবে গুজবের বুলেট।’

লেখক: সাংবাদিক

ব্রেকিংনিউজ/এমজি

bnbd-ads