অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধানে

এম আর খায়রুল উমাম
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
প্রকাশিত: ০১:৩৫ আপডেট: ০১:৪০

অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধানে

সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর বাংলাদেশ সফর করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষ লাভবান হবে এমন একটি ফর্মুলা বের করতে ভারত সম্মত রয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, তার দেশ অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধানে বদ্ধপরিকর। ভারত থেকে আমাদের দেশে ৫৩টি নদী প্রবেশ করেছে। দেশের সাধারণ মানুষ জানে- আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী তো নয়ই, বরং একটা নদীর জীবন রক্ষার নূ্যনতম পানিও উজানের দেশ থেকে পাওয়া যায় না। জানামতে, গঙ্গা নদীর পানি নিয়ে দু'দেশের মধ্যে একটা চুক্তি হলেও তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে আর তিস্তা নদীর পানি চুক্তি নিয়ে টালবাহানা চলমান। 

এমতাবস্থায় ভারত অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধানে বদ্ধপরিকর হলে দায়টা বাংলাদেশের ওপর পড়ে। জনগণ জানে না আমাদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের দেশের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর জন্য কী কী পরিকল্পনা বিদ্যমান? আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী নূ্যনতম কত পানি নদীর জীবন রক্ষার জন্য, পরিবেশ রক্ষার জন্য, নৌপথ ব্যবহারের জন্য, কৃষিকাজে সেচের জন্য, জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য, নিজেদের ব্যবহারের জন্য আমরা পেতে পারি? নদীতে পানির প্রাপ্যতার সঙ্গে প্রয়োজনের সমন্বয়ই সমস্যার সমাধান।

ভারত উজানের দেশ হওয়ায় একতরফাভাবে নদীর পানি প্রত্যাহার করেই চলেছে। তারা অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধানে বদ্ধপরিকর হওয়ার পরও একতরফা পানি প্রত্যাহার থেকে কোনো সময় সরে আসেনি। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে গঙ্গা নদীর পানি প্রত্যাহারের ফল নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন হচ্ছে না। গজলডোবায় বাঁধ দিয়ে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এখন তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে টালবাহানা করতে আলোচনার প্রয়োজন পড়ছে না। টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে মেঘনা-সুরমা নদীর পানি প্রত্যাহারের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই। 

অ্যাকুইডাক্ট বা কৃত্রিম পানি প্রণালি তৈরি করে মহানন্দার সম্পূর্ণ পানি প্রত্যাহার করে নিতে আলোচনার প্রয়োজন নেই। কোনো আলোচনার প্রয়োজন নেই ভারতজুড়ে নদীর আন্তঃসংযোগ নিয়ে। তবে আলোচনার প্রয়োজন ব্রহ্মপুত্র নদের উৎসমুখে চীনের বিশাল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ নিয়ে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মাথাব্যথা না থাকলেও আমরা জানি চীনা উদ্যোগ বিষয়ে আলোচনা না করার অর্থ সাপের লেজে পা দেওয়া।

অভিন্ন নদী নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন। কারণ আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। অভিন্ন নদী গঙ্গায় ফারাক্কা নির্মাণকালে ভারত-পাকিস্তান যে আলোচনা হয়, সেখানে পানির চাহিদা নিয়ে এক প্রকার ছেলেখেলা করা হয়। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প সম্পর্কে ভারত সরকারকে অবহিত করে এবং দুই হাজার কিউসেক পানির চাহিদার কথা জানায়। দুই দেশের মধ্যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের প্রথম বৈঠক বসে নয়াদিল্লিতে ১৯৬০ সালের জুন মাসে। ততদিনে ওয়াপদা চালু হয়ে গিয়েছে। পানি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পানি বিদ্যুৎ অথরিটি কাজ করছে। সেই বৈঠকে তখনকার পানি চাহিদা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় সাড়ে তিন হাজার কিউসেকে। বিশেষজ্ঞরা এভাবেই ধারাবাহিকভাবে পানির চাহিদা বাড়িয়ে যান। ১৯৬৮ সালের মে মাসে নয়াদিল্লির সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এপ্রিল মাসের জন্য চাহিদা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৪৯ হাজার কিউসেক। আমাদের বর্তমান প্রস্তুতিও এমন পর্যায়ে আছে কি-না ভেবে দেখা জরুরি।

ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের পাশাপাশি আমাদের 'আশু সমস্যার আশু সমাধান'-এর নীতি নদীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। প্রধানমন্ত্রী কয়েকদিন আগে একনেক সভায় বলেছেন, এখন থেকে নদীতে আর স্লুইসগেট নির্মাণ করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই। নদীমাতৃক এই দেশটার প্রাণ নদীগুলোতে স্লুইসগেট নির্মাণ করে নদীর জীবন সংকটাপন্ন করে তোলা হয়েছে, তা অনুধাবন করে এমন নির্দেশ প্রদান করার জন্য। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ছোট স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেই ছোট স্লুইসগেটগুলোরও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি। প্রয়োজনের তুলনায় ছোট ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করা হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, সবুজ বিপ্লব, গোলাপি বিপ্লব, স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভরাট ও দখল, দূষণ, যথেচ্ছ ব্যবহার ইত্যাদি নানাবিধ কারণও নদী ধ্বংসে কম ভূমিকা রাখেনি।

সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দেশের অভিন্ন নদীগুলোর জীবন রক্ষায় কী কী উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন তার একটা রূপরেখা তৈরি করে রাখতে পারে। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে কেউই চায় না বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা অতীতের মতো গঙ্গার পানি নিয়ে আলোচনার সময় যা করেছিলেন তার পুনরাবৃত্তি করুক। তাই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আমরা যাতে চাহিদার যৌক্তিকতা যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারি তার প্রস্তুতি রাখা জরুরি। 

স্মরণ রাখা প্রয়োজন, উজানের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে দেশের নদীগুলো গভীরতা হারিয়ে ফেলেছে, নদীর ধারণক্ষমতা কমে গেছে। প্লাবনভূমির কথা ভুলে গিয়ে নদীর মূল প্রবাহভূমি দখল ও ভরাটের মহাযজ্ঞ দেশব্যাপী চলেছে। তাই ইহকালে করার কোনো সম্ভাবনা নেই জেনেও ভারত যেহেতু অভিন্ন নদী সমস্যা সমাধানে বদ্ধপরিকর, তাই আন্তর্জাতিক নীতি অনুসারে তারা যদি পানি দিয়ে দেয় তাহলে দেশের অবস্থা কী হবে তা অনুমান করতেও ভয় হয়। সে বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু ভেবে দেখা প্রয়োজন। যদিও যে একটা মাত্র নদীর পানি চুক্তি হয়েছে, সেখানেও বাংলাদেশকে অনৈতিকভাবে কম পানি সরবরাহ করে বঞ্চিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের নদীতে চাহিদামতো পানি না পাওয়ার কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, দেশের নিম্ন বদ্বীপে প্রায় ২০ লাখ টন পলি জমা হচ্ছে আর উচ্চ বদ্বীপে গাছ মরে যাচ্ছে ও নদী গভীরতা হারাচ্ছে। পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে, মরুকরণের শঙ্কা দেখা যাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য ও নৌচলাচল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জনস্বাস্থ্যেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে এবং পানির মান কমে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গও এমন প্রভাবের বাইরে নেই। তাই দেশের সাধারণ মানুষের ভাবনায় আসতেই পারে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যা বলে গেছেন তা কথার কথা মাত্র। বিন্দুমাত্র আন্তরিকতা থাকলে এমন রসিকতা তিনি করতেন বলে মনে হয় না। তবে এই রসিকতা আমাদের আন্তরিক করে তুলতে পারে। আমরা নিজেদের চাহিদার ব্যাপারে সোচ্চার হতে পারি। 

সোচ্চার হওয়ার জন্য, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে গতিশীল ও দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তত্ত্বাবধানে নদী-সংশ্নিষ্ট ১৫টি মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে নদীর সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তা থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণের একটা সুপারিশমালা তৈরি করতে পারে। এই সুপারিশের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে পারে দেশের সব বিশেষজ্ঞকে সমন্বয় করে। এখানে আমাদের ভুল পরিকল্পনাগুলোকে চিহ্নিত করে তারও সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের আরও মনে রাখা দরকার, উজানের দেশ ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন করেই চলেছে। তিস্তা নদীর পানির হিস্যা পেতে ভারতের সঙ্গে ৪০ বছরের ওপর সময় ধরে আলোচনা চলছে। ইতিবাচক ফল এখনও কিছু হয়নি। ভারত নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতানৈক্যের অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশকে ন্যায্য পানির হিস্যা থেকে বঞ্চিত রেখেছে। পাশাপাশি গজলডোবায় তিস্তা নদীর বাঁধই শুধু নয়, এ বাঁধের মাধ্যমে তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে ভয়াবহ ভাঙন ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষ গজলডোবা বাঁধের ভাটিতে সীমান্তের জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত এক কিলোমিটারের মধ্যে ভারতীয় এলাকায় সুপরিকল্পিতভাবে ৫টি স্পার নির্মাণ করেছে। বিশ্বের অনেক নদী অভিন্ন। এক নয়, একাধিক দেশ নিয়ে প্রবাহিত। এ দেশগুলো সম্মিলিতভাবে যৌথ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলছে। অথচ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তিস্তা নদীর মতো করেই আমাদের অন্য অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। বর্তমানে তারা হয়তো এভাবেই অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষই লাভবান হবে এমন একটা সমাধানসূত্র বের করতে সম্মত হয়েছে। এভাবেই অভিন্ন নদীর সমস্যা সমাধানে তারা বদ্ধপরিকর। 

আমাদের তিস্তা নদীর পাশাপাশি তিস্তা সেচ প্রকল্পও এখন হুমকির মুখে। ৫৩টি নদীর সবগুলোরই কমবেশি একই অবস্থা। মহাজোট সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের সুসম্পর্ক বিদ্যমান। দেশে প্রবাহিত সব অভিন্ন নদীকে বাঁচাতে মহাজোট সরকার এই সুসম্পর্ককে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকভাবে ব্যবহার করবে, এটাই কাম্য। যত তাড়াতাড়ি সব নদী নিয়ে আলোচনা শুরু করা হবে, ততই মঙ্গল। আন্তর্জাতিক নীতি অনুসারে নূ্যনতম পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা না গেলে দেশের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

লেখক: সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads