সংবাদ শিরোনামঃ
bnbd-ads
bnbd-ads

সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হোক উন্নয়ন-অগ্রগতির লক্ষ্য

মোনায়েম সরকার
৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ১০:১৮ আপডেট: ১০:৩৫

সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হোক উন্নয়ন-অগ্রগতির লক্ষ্য

সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে— ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’। আমার মনে হয় কথাটি সর্বাংশে ঠিক না। অবশ্যই রাজনীতিতে শেষ কথা আছে। সবকিছুর শেষ থাকলে রাজনীতির কেন শেষ থাকবে না? রাজনীতি কি তাহলে এমন কোনো অসীম প্রতিষ্ঠান, যার শেষ থাকা সম্ভব নয়? আমার মনে হয়, উল্লিখিত প্রশ্নগুলো নতুন দৃষ্টি দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।

ষাটের দশকে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন বিশ্বকে যেভাবে দেখেছি, আজকের বিশ্ব কিন্তু তেমনটি নেই। তখন মনে হয়েছিল সারা দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র কায়েম হতে চলেছে। সাম্যবাদী পৃথিবী নির্মাণের জন্য সেদিন অনেকের মতো আমিও যোগ দিয়েছিলাম সমাজতন্ত্রের পতাকাতলে। একসময় আমাদের মোহভঙ্গ হয়। পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। দোর্দণ্ড প্রতাপে পুঁজিবাদ চেপে বসে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ঘাড়ে।

মুখ থুবড়ে পড়ে মার্ক্স-অ্যাঙ্গেলস-লেনিনের তত্ত্ব। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের চাপে বিপরীত মুখে যাত্রা করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো। এর ফলে বিশ্ব আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে স্নায়ুযুদ্ধের সম্ভাবনায়। শান্তি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। দেশে দেশে বেড়ে যায় স্বার্থবাদী মানুষের সংখ্যা। অঢেল সম্পদের লোভে উন্মত্ত হয়ে ওঠে দিশেহারা মানুষ। দেশে দেশে শুরু হয় স্বৈরাচারী সামরিক শাসন। ঘুষ-দুর্নীতি বেড়ে যায়। প্রত্যাশিত মানবিক বিশ্ব রূপান্তরিত হয় অমানবিক দানবে। মানুষ হিসেবে মানুষের কল্যাণ চিন্তাই আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হওয়া দরকার। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত অশুভকে ডেকে আনছি। সভ্যতা ধ্বংস করে ডেকে আনছি অসভ্যতা। সমৃদ্ধ দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে পরিণত করছি ধ্বংসস্তূপে। একবিংশ শতাব্দীর এমন মুহূর্তে যে দৃশ্য কল্পনা করা অসম্ভব, সে দৃশ্যগুলোই এখন মঞ্চস্থ হচ্ছে বিশ্বরাজনীতিতে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে যে গণরায় দিয়েছে, তা ইতিহাসে নজির সৃষ্টি করেছে। এ গণরায়ের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা সরকার তথা আওয়ামী লীগের ওপর গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছে। সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা এবং সব দলের মতামতের ভিত্তিতে উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। কিন্তু এ কঠিন কাজটি শেখ হাসিনা সরকারকে অবশ্যই দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে বিন্দু পরিমাণ অবহেলা ভবিষ্যতে কী ফল বয়ে আনবে, তা সঠিকভাবে বলা না গেলেও কেবল এটুকু বলা যায় যে, মানুষ আওয়ামী লীগের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ভারতবর্ষে কংগ্রেসের স্থান দখল করেছে সাম্প্রদায়িক বিজেপি।

বাংলাদেশের সামনে আওয়ামী লীগ সরকার বেশকিছু অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সহাবস্থান সৃষ্টি করে শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করেছে, যা এতদিন বাংলাদেশের মানুষ মনে-প্রাণে প্রত্যাশা করেছিল। সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলোর প্রত্যেক জনপ্রতিনিধি তাদের ওপর অর্পিত ও সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন— এমনটাই প্রত্যাশা করে এ দেশের জনগণ। বাংলাদেশের মানুষ এখন নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধতে শুরু করেছে। এ দেশ থেকে দুর্নীতি দূর হবে, অফিস-আদালতে ঘুষ-বকশিশ বন্ধ হবে— এমনটাই সবার আন্তরিক প্রত্যাশা। সরকার একটু জনবান্ধব হলেই ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করে জনসেবায় মনোযোগ দিতে পারেন। এমপি-মন্ত্রীদের বানাতে পারেন জনগণের সেবক। আমি মনে করি, বর্তমান সরকার অবশ্যই জনবান্ধব নিয়মনীতি গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের পক্ষে অবস্থান নেবে এবং মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করবে।

বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষেই একটি দরিদ্র দেশ। এ দেশের গ্রামীণ মানুষগুলো এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। সরকার এবারের ইশতেহারে ‘গ্রাম হবে শহর’ স্লোগান দিয়ে মানুষের প্রত্যাশাকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্রামকে শহরে রূপান্তরিত করার সরকারি সদিচ্ছাকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই, তবে গ্রামকে শহর বানানোর নামে এমপি-মন্ত্রী ও দলীয় লোকজনের পকেট যেন অসম্ভব রকম ফুলেফেঁপে না ওঠে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কেউ যেন ব্যক্তিগত অপরাধ ক্ষমতাসীন দলের ওপর চাপানোর সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ধনী লোকের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু কারা ধনী হচ্ছে— এ বিষয়ে নজর রাখা দরকার। একটি কথা আছে, ‘পাওয়ার ইজ মানি’। যারা ক্ষমতায় ও উচ্চপদে আসীন, তারা ছাড়া আর কেউ বাংলাদেশে ধনী হতে পারছে না। তাই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য প্রতিদিনই ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিচ্ছে চিহ্নিত ও ছদ্মবেশী সুবিধাবাদীরা। এসব সুবিধাবাদী মুনাফালোভীর হাতে কিছুতেই ক্ষমতার ভার অর্পণ করা সমীচীন হবে না। কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থের জন্য সরকারের ভাবমূর্তিতে কলঙ্ক লেপন করলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে বহিষ্কার কিংবা অনুরূপ কোনো গুরু শাস্তির দণ্ড দিতে হবে। উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল কথাই হলো সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে, দেশে আইনের শাসন না থাকলে, সে দেশ কোনো দিনই উন্নতির শিখরে উঠতে পারবে না।

বাংলাদেশের মতো হতদরিদ্র দেশে এমপি-মন্ত্রীরা সীমাহীন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। তারা উচ্চমূল্যের শুল্কমুক্ত গাড়ি, প্লট, আবাসন সুবিধাসহ এমন চোখ ধাঁধানো জীবনযাপন করেন, যা কেবল ইউরোপের মতো উন্নত দেশেই সচরাচর দেখা যায়। একজন মানুষের বিলাসিতার জন্য ৪ কোটি, ৫ কোটি টাকার গাড়ি কেন কিনতে হবে, তা ভেবে পাই না। আজকাল যারা এমপি-মন্ত্রী হন, তারা কেউই গরিব ঘরের সন্তান নন। জনপ্রতিনিধিদের কাছে মানুষ সেবা প্রত্যাশা করে, শোষণ নয়। বাংলাদেশের এমপি-মন্ত্রীরা নিজ নিজ এলাকাকে যেন কিছুতেই শোষণ ক্ষেত্র মনে না করেন। এ ব্যাপারে আমি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। সরকার আইন করে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি বন্ধ করতে পারে।

একটি দেশের ৯০ শতাংশ মানুষকে গরিব রেখে ১০ শতাংশ মানুষের বিলাসী জীবন-যাপন শুধু হাস্যকর নয়, একে প্রহসন বলেই মনে হয়। এবার যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাদের উদ্দেশে লেনিনের এ কথাটি বলতে চাই— ‘মানুষ পৃথিবীতে মাত্র একবারই আসেন। তাই তাকে এমনভাবে জীবন যাপন করতে হবে, যেন মৃত্যুকালে সে বলতে পারে— আমি আমার জীবন উৎসর্গ করেছি মানবজাতির কল্যাণের জন্য।’ আসলেই তাই— এমনভাবে আমাদের জীবন যাপন করা উচিত, যেন আমরা মৃত্যুর সময় বলতে পারি— আমাদের জন্ম বৃথা যায়নি। একজন মানুষ ইচ্ছা করলেই এমন একটি দৃষ্টান্তযোগ্য জীবনের অধিকারী হতে পারে, এখন তিনি মহৎ জীবনের অধিকারী হতে চান কিনা সেটাই প্রশ্ন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ‘ক্যারিশম্যাটিক লিডার’ ছিলেন। শেখ হাসিনার মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর এ গুণটি আছে। আজ সব দল-মতের মানুষ শেখ হাসিনার কাছে ভালোবাসা ও আশ্রয়প্রার্থী। শেখ হাসিনাও তাদের আগলে রাখছেন পরম মমতায়। অন্যান্য দলের যারা আজ শেখ হাসিনার সঙ্গে আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করছেন (পত্রপত্রিকার ছবি দেখে অনুমান করছি), তাদের উদ্দেশে বলতে চাই— আপনারা জীবনভর অনেক উল্টাসিধা, সুবিধাবাদী রাজনীতি করেছেন, বারবার নীতি-আদর্শ পরিবর্তন করেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে এখন আর রূপ বদলাবেন না। নীতি-আদর্শ মেনে রাজনীতি করুন এবং দেশ গড়ুন। টলস্টয় বলেছেন, ‘একজন মানুষের সাড়ে তিন হাত জমি প্রয়োজন’। আমিও বলতে চাই, অর্থ-সম্পদ-ক্ষমতার লোভ পরিহার করে, অতীত অভিমান ভুলে গিয়ে সবাই মিলে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ুন, রাজনীতি দুর্নীতিমুক্ত হলে দেশ থেকে সব অনিয়ম এমনিতেই নির্বাসনে যাবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads
bnbd-ads