কোরবানির ইতিহাস, প্রচলন ও নেপথ্যের কাহিনী

ধর্ম ডেস্ক
৯ আগস্ট ২০১৯, শুক্রবার
প্রকাশিত: ০৯:০৫ আপডেট: ১২:৫৮

কোরবানির ইতিহাস, প্রচলন ও নেপথ্যের কাহিনী

কোরবানির বিধান আদি পিতা আদম (আ.) এর যুগ থেকেই ছিল। আদমের দুই পুত্র হাবীল ও কাবীলের কোরবানির কথা পবিত্র আল কোরআনেই বলা আচে। যাদের একজনের কোরবানি মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে কবুল হলেও অন্যজনের কোরবানি কবুল হয়নি। সেখান থেকেই প্রথমত কোরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন।

কিন্তু বর্তমান বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা যে পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন তার শুরুটা হয়েছিল মূলত হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর দেখানো পথ ধরেই। 

নমরুদ ও তার সহযোগীদের দ্বারে অত্যাচারিত হয়ে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে একবার স্ত্রী হযরত সারাকে সঙ্গে নিয়ে শাম দেশে হিজরত করলেন হযরত ইব্রাহীম। কিন্তু শাম দেশের বাদশাহ ছিলেন খুবই জালিম ও খারাপ লোক। হযরত ইব্রাহীম ও তার সুন্দরী স্ত্রীর আগমনের খবর পেয়ে তাদেরকে ধরে নিয়ে আসার হুকুম করেন বাদশাহ। 

এক পর্যায়ে বাদশাহর লোকেরা হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও তার স্ত্রী সারাকে রাজদরবারে হাজির করলে বাদশাহ হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর কাছে জানতে চায় স্ত্রী লোকটির পরিচয়। ইব্রাহীম চিন্তা করলেন, স্ত্রী বললে হয়তো বা তাকে মেরে ফেলতে পারে। তাই তিনি বলেন, সারা তার দ্বীনি বোন। 

এরপরই বাদশাহ হযরত ইব্রাহীম (আ.) কে বন্দি করে সারাকে তার লালসার শিকার বানাতে চায়। সারা রাজি না হলে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। 

এমন পরিস্থিতিতে সারা দুই রাকাত নামাজ আদায়ের অনুমতি চান বাদশার কাছে। অনুমতি দেয়া হলে সারা নামাজ শেষে আল্লাহ দরবারে ফরিয়াদ করেন- যেন আল্লাহ তায়ালা তার সতীত্ব রক্ষা করেন। এই ফরিয়াদের পরই বাদশাহ খুবই অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েন। কিন্তু অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, তখন সারা চিন্তা করতে থাকেন- যদি বাদশাহ মারা যান তবে লোকে তাকে দায়ি করবে। এরপর সারা বাদশার সুস্থতার জন্য দোয়া করেন।

একে একে তিনবার একই ঘটনা ঘটলে বাদশাহ সারার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সারার সতীত্ব দেখে আরেক সতী নারী হযরত হাজেরাকে তার দাসী হিসেবে দিয়ে তাদেরকে বিদায় করে দেন বাদশাহ।

হযরত সারা ও হযরত ইব্রাহীম (আ.) মুক্ত হয়ে সে দেশে বসবাস শুরু করেন। হযরত সারা তার দাসী হযরত হাজেরাকে হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর সঙ্গে বিয়ে দেন। কারণ হযরত সারার বয়স তখন ৯০ বছর আর হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর বয়স তখন ১০০ বছর। তাদের বিয়ের দীর্ঘ সময় পার হলেও তখনও হযরত সারা মা হতে পারেননি।

তিনি ভাবলেন, শেষ বয়সে যদি আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানি করে তার স্বামী হযরত ইব্রাহীম (আ.)কে কোন সন্তান দান করেন। আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানিতে এই হাজেরার গর্ভেই হযরত ইসমাইল (আ.)-এর জন্ম হয়। 

জন্মের পরই আল্লাহতায়ালার নির্দেশে কলিজার টুকরা ছেলে ও স্ত্রী হাজেরাকে কাবা ঘরের নিকটবর্তী সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের পাদদেশে নির্জন স্থানে সামান্য খেজুর ও এক মসক পানিসহ রেখে আসেন হযরত ইসমাইল (আ.)। স্ত্রী-পুত্রকে এভাবে একা রেখে যাওয়ার সময় হাজেরাজ ইব্রাহীমের কাছে জানতে চান- আপনি আমাদের এভাবে একা রেখে চলে যাচ্ছেন? উত্তরে ইব্রাহীম শুধু ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘হ্যাঁ’।

হাজেরা যখন স্বামীর কাছে জানতে চান- এটা কি আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ? তখনও হযরত ইব্রাহীম (আ.) আবারও জবাবে বলেন ‘হ্যাঁ’। এর পর সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করে সেখানেই কোলের সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন হযরত হাজেরা।

এক সময় তাদের খাদ্য ও পানীয় শেষ হয়ে গেল। তেষ্টায় পুত্র ইসমাইল কান্নাকাটি করছে। মা হাজেরা পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ি করছেন। কিন্তু পানি পাচ্ছেন না। ঠিক এমন সময় হাজেরা দেখতে পান- তার পুত্র ইসমাইলের পায়ের গোড়ালির আঘাতে মাটি ফেটে পানির ফোয়ারা প্রবাহিত হচ্ছে। যে ফোয়ারা বর্তমানে বিশ্ব মুসলিমদের কাছে জমজম নামে পরিচিত। যার সুপেয় পানি পানে পরিতৃপ্ত হন মুসলমানরা। 

এর পর মা হাজেরা নিজেও সেই পানি পান করলেন ও তার শিশুপুত্রকেও তৃপ্তির সঙ্গে পানি পান করালেন। হযরত হাজেরার সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে ক্রমাগত ৭ বার দৌড়াদৌড়ি করার কারণে সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে আল্লাহ তায়ালা হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্যে সাফা মারওয়া পাহাড়ে ৭ বার দৌড়াদৌড়ি করার বিধান জারি করেছেন। 

হযরত ইসমাইল (আ.) এর যখন হাঁটাচলা ও খেলাধূলা করার বয়স তখন হযরত ইব্রাহীম (আ.)কে স্বপ্নে আদেশ করা হলো, তুমি তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে কোরবানি করো। ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ১০টি উট কোরবানি করলেন। পুনরায় তিনি আবারও একই স্বপ্ন দেখলেন। অতঃপর ইব্রাহীম (আ.) আবারও ১০০টি উট কোরবানি করলেন। আবারও তিনি একই স্বপ্ন দেখে ভাবলেন, আমার কাছেতো এ মুহূর্তে আমার কলিজার টুকরা প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.) ছাড়া আর তেমন কোনও প্রিয় বস্তু নেই। 

ইসমাইল (আ.) যখন পিতার সঙ্গে হাঁটাচলার উপযোগী হলো তখন ইব্রাহীম (আ.) বললেন, হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কোরবানি করছি। সুতরাং তোমার মতামত কি? হযরত ইসমাইল (আ.) বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন। আপনি আমাকে আল্লাহর মেহেরবানিতে ধৈর্যশীলদের একজন পাবেন। 

এর পর পিতা-পুত্র সিদ্ধান্তে এক হলেন ও আল্লাহর ইচ্ছার সামনে আত্মসমর্পণ করলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ইব্রাহীম (আ.) প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাইলকে (আ.) জবাই করার জন্য কাত করে শুইয়ে দিলেন, তখন আল্লাহর নির্দেশে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে গেলো। যেটিকে চিরকাল মুসলিমরা ইব্রাহীম ও ইসমাইলের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার একটা কঠিন পরীক্ষা বলেই বিশ্বাস করেন। 

ঠিক এর পর থেকেই পৃথিবীতে কোরবানির প্রচলন শুরু হয়। যা আজও বিদ্যমান। আর ত্যাগের সু-মহান ও অনুপম দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় রাসুল মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মতের ওপর পশু কোরবানি ওয়াজিব করে দেন। যে কোরবানি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর ত্যাগকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

ব্রেকিংনিউজ/এমআর