যে কারণে ঢাকার আকাশে ড্রোন নিষিদ্ধ

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
২৫ আগস্ট ২০১৯, রবিবার
প্রকাশিত: ০৯:১৫ আপডেট: ০৫:০৭

যে কারণে ঢাকার আকাশে ড্রোন নিষিদ্ধ

হঠাৎ করেই ঢাকার আকাশে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ। ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ড্রোন ওড়ানোর জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অনুমতি লাগতো। কিন্ত সেটা মানতো না কেউই। এ নিয়ে অবশ্য মাথাব্যথাও ছিল না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিনোদনের জন্য বা ছবি ধারণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই বিভিন্ন ড্রোন উড়িয়ে থাকেন, যা দণ্ডনীয় অপরাধ।

ঢাকার আকাশে ওড়ানো ড্রোনগুলো বেশির ভাগ ছিল ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফি কাজে ব্যবহার করার জন্য। তবে সম্প্রতি ড্রোন ব্যবহারে ঝুঁকির আশঙ্কা করছে পুলিশ। তারা বলছে, রাষ্ট্রীয় সংরক্ষিত এলাকায় ড্রোনের হঠাৎ প্রবেশে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। এমন কয়েকটি ঘটনার কারণে ড্রোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ বলছে, কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিনোদনের জন্য বা ছবি ধারণের জন্য বা অজ্ঞাত কারণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ড্রোন উড্ডয়ন করছে। যেকোন ধরনের ড্রোন উড্ডয়নের জন্য অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এখতিয়ারভুক্ত। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ড্রোন উড্ডয়ন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তাছাড়া অননুমোদিত ড্রোন উড্ডয়ন জননিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টি করাসহ জনমনে ভীতির সঞ্চার করতে পারে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, ড্রোন নিয়ে একটি নীতিমালা রয়েছে বেবিচকের। রেগুলেশন ফর অপারেটিং রিমোটলি পাইলট এয়ারক্রাফট সিস্টেম (আরপিএএস) নামে এ নীতিমালায় বলা হয়েছে- আঠারো বছরের কম বয়সী কেউ ড্রোন ওড়ানোর অনুমতি পাবেন না। মদ্যপানের আট ঘণ্টার মধ্যে কেউ ড্রোন ওড়াতে পারবেন না। ড্রোনটি কোনও ক্ষতি সাধন করলে, ক্ষতির দায় ড্রোনের মালিককে বহন করতে হবে। ড্রোন যে স্থানে ওড়ানো হবে, সে স্থানের ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশকে অবহিত করতে হবে। ভূমি থেকে ২০০ ফিটের বেশি উচ্চতায় ড্রোন ওড়ানো যাবে না। যেকোনও বিমানবন্দরের ১০ নটিকেল মাইলের মধ্যে ড্রোন ওড়াতে হলে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরের অ্যারোড্রম অপারেটরের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। একজন ব্যক্তি এক সঙ্গে একাধিক ড্রোন ওড়াতে পারবেন না।

নীতিমালা অনুসারে ড্রোন ওড়ানোর ৪৫ দিন আগে বেবিচক থেকে অনুমতি নিতে হবে। নির্ধারিত ফরমে আবেদন করলে সেটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে অনুমতি দেয় বেবিচক। পাঁচ পৃষ্ঠার এ আবেদন পত্রে ড্রোন কোথায় ওড়ানো হবে, কে ওড়াবে, ড্রোনের আকার, সেফটি বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিতে হয় আবেদনকারীকে। বর্তমানে মাসে শতাধিক আবেদন জমা পড়ে সিভিল এভিয়েশনে। একই সঙ্গে এ নীতিমালা সংশোধন করে ড্রোনের রেজিস্ট্রেশন ও ড্রোন চালকদের লাইসেন্সিং এর আওতায় আনার উদ্যোগ নিচ্ছে বেবিচক।

সূত্রে জানা গেছে, এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন আর অনুমতি প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বেবিচকের কার্যক্রম। অনুমতি নেয়ার পর যথাযথ স্থানে নিয়ম মেনে ড্রোন ওড়ানোর বিষয়ে কোনও নজরদারি নেই বেবিচকের। এমনকি অনুমতি ছাড়া ড্রোন ওড়ানো হচ্ছে কিনা সে বিষয়েও নজরদারির সক্ষমতা নেই সংস্থাটির।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ফ্লাইট সেফটি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ড্রোন নিয়ে বেবিচকের একটি নীতিমালা আছে। এই নীতিমালা করা হয়েছে আকাশে এয়ার ক্রাফটের নিরাপত্তা ও নিরাপদ ড্রোন উড্ডয়ন নিশ্চিত করতে। কিন্তু বেবিচকের এখন যে জনবল তা অন্যান্য কাজের জন্য যথেষ্ট নয়, ড্রোন মনিটরিংয়ের জন্য বাড়তি লোকবল কাজে লাগানোর অবস্থানে নেই। আমরা ভূমি থেকে ২০০ ফুটের মধ্যে ড্রোন ওড়ানোর অনুমতি দিচ্ছি। কিন্তু সেটি অতিক্রম করে ৫০০ বা ৬০০ ফিটে গেলে শনাক্ত করা কঠিন। আমাদের যে রাডারটি রয়েছে, সেটি অনেক পুরনো। লো লেভেলে ফ্লাইং অবজেক্টকে ডিটেকক্ট করার সক্ষমতা নেই এ রাডারটির। একই সঙ্গে রাডারটির কার্যক্ষমতার সীমারেখাও সীমিত।

হঠাৎ করে ড্রোন উড্ডয়নের ওপর বিধিনিষেধ জারি করার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, হঠাৎ করে ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়নি। এমন সিদ্ধান্ত আগেই ছিল, তবে নতুন করে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি দেখা গেছে ঢাকার আকাশে এলোমেলোভাবে ড্রোন উড়ছে। যদিও এগুলো বিনোদন ও ভিডিও চিত্র ধারণ করার জন্য ওড়ানো হয়েছে। কিন্ত অপরাধীরা এটার সুযোগ নিতে পারে বলে আমাদের মনে হয়েছে।’

কৃষ্ণপদ রায় আরও বলেন, ‘দেশের সংরক্ষিত এলাকায় ড্রোন ওড়ানোর একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। অবশ্য ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে সন্দেহজনক কোন কিছু পাওয়া যায়নি। তারপরও বিষয়টি নিয়ে আমরা সতর্ক।’

অন্যদিকে অনুমতি ছাড়া ড্রোন ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও অবৈধ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তির বিধান নেই। তাই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নানা প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ড্রোন কিনছে ও ব্যবহার করছে।

অবশ্য বিদেশ থেকে অবৈধভাবে ড্রোনগুলো প্রবেশের সময় বিমানবন্দর নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ জব্দ করছে। সূত্র বলছে, গত ৫ বছরে শতাধিক অভিযানে প্রায় ৩৫০টির মতো ড্রোন জব্দ করেছে বিমানবন্দর নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ। ৩-৪ কেজি ওজনের ইনবিল্ট ক্যামেরা সমৃদ্ধ এসব ড্রোনের দাম ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বোর্ডের সাবেক সদস্য শহিদুল আলম বলেন, ‘ড্রোনের ব্যবহার বিধি আরও সহজ করা দরকার। পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি ড্রোন ব্যবহার হয়। তাই আমাদের এ নীতিমালাগুলো স্পষ্ট ও সহজ হওয়া দরকার। কেউ যদি ভালো কাজে ড্রোন ব্যবহার করতে চায় তাকে ব্যবহার করা বা ড্রোন কেনার অনুমতি দেওয়া উচিত। তবে নিরাপত্তার বিষয়টিতে ফোকাস রেখেই।’

ব্রেকিংনিউজ/টিটি/ এসএ