হোটেলের স্পা গার্ল থেকে সিটি ব্যাংকের এভিপি, অতঃপর ‘সেই পপি’

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
২৯ আগস্ট ২০১৯, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ১২:৫৬ আপডেট: ০৪:৫৮

হোটেলের স্পা গার্ল থেকে সিটি ব্যাংকের এভিপি, অতঃপর ‘সেই পপি’

দি সিটি ব্যাংক লিমিটেডের চাকরিচ্যুত অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মনিরা সুলতানা পপিকে ব্যবহার করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন ব্যাংকটির সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা। ব্যাংকটির সাবেক এএমডি ও ডিএমডি সেসময় এমডি হতে না পারায় ক্ষোভ থেকে বর্তমানে এই ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের অভিযোগে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিটি ব্যাংকে মনিরা সুলতানা পপির নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বচ্ছ। ব্যাংকে চাকরির কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। পপি সিটি ব্যাংকের আগে অন্য কোনও ব্যাংকেও চাকরি করেননি। এক সময় তিনি রেডিসন হোটেলের স্পা গার্ল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে সিটি ব্যাংকের সাবেক এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ব্যাংকটিতে যোগদান করতে সমর্থ্য হন। চাকরিতে যোগদানের পরবর্তী সময়ে ব্যাংকে কর্মরত অবস্থায় তার জীবনযাপন ও চলাফেরায় আগের উগ্রতা প্রকাশ পায়। এরই মধ্যে পপি সিটি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসাইনের ব্যক্তিগত সহকারীর দায়িত্ব পেয়ে যান। এই সুবাদে ব্যাংকের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গোপনে অবৈধভাবে ড্রাইভারদের ওপর নিজস্ব প্রভাব খাটিয়ে মোট ২৫০ দিন মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত গাড়ি ব্যবহার করেন পপি। 

ব্যাংকের ড্রাইভারদের বক্তব্য অনুযায়ী, মনিরা সুলতানা পপি মধ্যরাতে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, পার্লারসহ অন্যান্য স্থানে যেতেন। মধ্যরাতে ওইসব স্থানে যাওয়ার সময় অপরিচিত লোকজন গাড়িতে উঠে বসতেন। পপি নিয়মিত নেশা করতেন বলেও ড্রাইভারদের বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে। এসব প্রমাণাদি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেনের ব্যক্তিগত সহকারী পপির বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী নানা অভিযোগ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পে-রোল ব্যাংকিং বিভাগে তাকে বদলি করা হয়। বদলির পর থেকে পপি দীর্ঘদিন কর্মস্থলে কোনও ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়াই অনুপস্থিত ছিলেন। ব্যাংকের নিয়ম ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাকে তিনবার রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠায় কর্তৃপক্ষ। তারপরও তিনি কর্মস্থলে যোগদান না করায় এবং অননুমোদিত অনুপস্থিত থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি পান।

সূত্র আরও জানায়, প্রভিডেন্ট ফান্ড ঋণ, হাউজ বিল্ডিং ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও গাড়ির ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণখাতে মনিরা সুলতানা পপির কাছে তার চাকরিরত থাকাকালে যাবতীয় প্রাপ্ত টাকা সমন্বয় করার পরও ব্যাংকের প্রায় ১ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য তাকে নোটিশও দিয়ে যাচ্ছে। নোটিশের কোনও উত্তর পপি দেননি। উল্টো সিটি ব্যাংক এবং ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনাম, সম্মানহানি, ব্ল্যাকমেইল করাসহ ব্যক্তিগত ক্ষোভ চরিতার্থ, অন্যায় ও অবৈধভাবে ৫ কোটি টাকা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছেন।

পপির ৫ কোটির টাকা চাঁদা দাবির ৪৫ মিনিটের ভয়েজ রেকর্ডও ব্যাংকের কাছে রয়েছে বলে সূত্র জানায়। পাশাপাশি ব্যাংকে চাকরির আড়ালে নিজের একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন পপি। লেগেসি মেকওভার (বিউটি পার্লার), লেগেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রি স্কুল অ্যান্ড ডে-কেয়ার (স্কুল), লেগেসি গ্লোবাল কনসালটেন্সি (এজেন্ট ব্যাংকিং), এনএমসি এন্টারপ্রাইজ (এজেন্ট ব্যাংকিং) নামে তার চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা সিটি ব্যাংকের সঙ্গে তার চাকরির শর্তের খেলাপ হয়েছে। তার এইসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। তার চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাগুলো- (লেগেসি মেকওভার) এইচ-২৭৭, রোড-১৬, ব্লক- কে, দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা, (লেগেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রি স্কুল অ্যান্ড ডে-কেয়ার) এইচ-৭০, রোড-৬, ব্লক-বি, দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা, (লেগেসি গ্লোবাল কনসালটেন্সি) বনশ্রী, ঢাকা, (এনএমসি এন্টারপ্রাইজ) এইচ-৭০, রোড-৭, বক্ল-বি, দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা। এসব ঘটনায় ২০ আগস্ট মনিরা সুলতানা পপির বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় একটি মামলা করেছেন সিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের লিগ্যাল ডিভিশনের হেড অব কোর্ট অপারেশন একেএম আইয়ুব উল্লাহ।

মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা পপি চাকরিতে পুনর্বহালসহ নগদ ৫ কোটি টাকা ও বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার অযৌক্তিক দাবি করেছেন। এসব দাবি মেনে নেয়া না হলে এমডিকে চাকরি করতে দেবেন না এবং নানাভাবে হয়রানি করারও হুমকি দেন। এমনকি এমডির সম্মানহানি করার হুমকিও দিয়েছেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) স ম কাইয়ূম ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘সিটি ব্যাংকের অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে এর তদন্তও শুরু হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখন কিছু বলা যাচ্ছে না।’ 

সিটি ব্যাংকের এমডি মাশরুর আরেফিন মামলা প্রসঙ্গে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, আমার বিরুদ্ধে, আমি ও আমার দুই সিনিয়র সহকর্মীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে, ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত এক নারী নোংরা হয়রানির অভিযোগ এনেছেন। মেইনস্ট্রিমের পত্রিকাগুলির মধ্যে একটি পত্রিকা তা নিয়ে দুটি স্টোরি করেছে। ইতোমধ্যে মহামান্য উচ্চ আদালত আমাদেরকে জামিন দিয়েছেন। সিটি ব্যাংকও পরে, যৌক্তিক কারণে, এই নারীর নামে প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মামলা করেছে।

তিনি আরও লিখেন, ‘দেশে সুনামের দিক থেকে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় লোকাল ব্যাংকটির এমডি হিসেবে আমাকে নিশ্চিত এসব ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে দিয়ে মাঝেমধ্যেই যেতে হবে, কারণ সেটাই আমাদের এখানকার পৃথিবীর নিয়ম, যেখানে এখনও গুজব শাসন করে জনমত, এবং ঋণখেলাপ-জালিয়াতি-প্রতারণা যেখানে ঝড়ের বেগে নির্মীয়মান এই বড় অর্থনীতির এক রূঢ় বাস্তবতা।’

ব্যাপারটি এখন বিচারাধীন। সে কথা মাথায় রেখেও ক’দিন ধরে ভাবছি যে আমি আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রকৃত ঘটনার পূর্বাপর তুলে ধরে আমার বক্তব্যটা জানাব ফেসবুকে। কিন্তু বারবারই মনে হয়েছে কী দরকার এরকম এক ডাহা মিথ্যে নিয়ে নিজের ভাষ্য দিতে গিয়ে বিষয়টার গুরুত্ব আরও বাড়ানোর? কিন্তু শেষমেশ পরাস্ত হতে হলো ফেসবুকের গলি-তস্যগলিতে ছড়াতে থাকা কিছু পোস্টের কারণে, যেখানে তথাকথিত কিছু লেখক এই ঘটনার লেজ ধরে আমার লেখকসত্তার উপরে আঘাত হানতে চাইছেন, ব্যাংকের এডমিনিস্ট্রিটিভ বিষয়কে আমার সাহিত্যচর্চার সঙ্গে মিলিয়ে একের পর এক পাশবিক পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন, এবং লেখকের নৈতিকতার মতো বড় এক দার্শনিক বিষয়ে কথা বলার ছদ্মবেশে মূলত আমার চরিত্র বিশ্লেষণকারী গণদেবতার ভূমিকায় নেমেছেন।

অতএব নিচের এই ব্যাখ্যা, যা আমি লিখছি আমার পাঠকদের উদ্দেশে—অর্থাৎ যে-ব্যাখ্যার উৎসমুখে আছে আমার লেখকসত্তা, ব্যাংকের এমডির পদবী নয়। এখানে কোনও ফাঁকি, কপটতা, ওপরচালাকির ব্যাপার নেই। আছে যা ঘটেছিল তার স্পষ্ট, সাদাসিধে বয়ান।

আমি সিটি ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিই ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে। এর চারদিন পরেই, ২১ জানুয়ারি, ব্যাংকের বেশ কিছু আইন ভঙ্গ ও ভাবমূর্তি পরিপন্থী কাজ করার কারণে ওই নারীকে অন্য চাকরি খোঁজার জন্য বলি। কেন আমি তাকে এটা বললাম?

ঘটনা আরও অনেক আগের। তিনি ছিলেন আমাদের প্রাক্তন এমডির পি.এস.। এক এক করে বলা যাক:

১. বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ৩১.১২.২০১৭-র অডিট রিপোর্টে আমাদেরকে লিখিতভাবে অডিটরদের সঙ্গে তার অসহযোগিতা সংক্রান্ত একটি অভিযোগ জানান।

২. এরপর ল্য মেরিডিয়েন হোটেলের কর্তারা গত সেপ্টেম্বরে সশরীরে ব্যাংকে এসে আমাদেরকে জানান যে আমাদের এই নারী কর্মী তাদের হোটেলের রেস্টুরেন্ট/বেকারিতে নিজের ব্যক্তিগত লোকজন নিয়ে ব্যাংকের নামে ‘বকেয়া’ বিল করে চলেছেন এবং ব্যবহারও খারাপ করছেন।

৩. অক্টোবর ২০১৮ নাগাদ ব্যাংকের ড্রাইভাররা তার বিরুদ্ধে হিউম্যান রিসোর্সেস ডিপার্টমেন্টে নানা অভিযোগ জানাতে থাকেন। তখন পর্যন্ত তিনজন ড্রাইভার লিখিত জানান যে, তিনি অফিসের পর সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত এবং কখনও কখনও ভোর অবধি ব্যাংকের পুলের গাড়ি নিয়ে নানা জায়গায় যান এবং তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে পরে বেরিয়ে আসে যে, তিনি মোট ২০০ রাতের বেশি রাত ব্যাংকের পুলের গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে গিয়েছেন। ১৫ জন ড্রাইভার তাদের লিখিত জবানীতে আমাদেরকে এ-বিষয়ে অনেক কিছু জানান। এরই পরিণতিতে পরে (এপ্রিল ২০১৯-এ) পুল কারের দায়িত্বে থাকা ব্যাংকের জেনারেল অ্যাডমিন বিভাগের একজনের চাকরি চলে যায় এবং আরও দুজন অন্য শাস্তিপ্রাপ্ত হন।

৪. ড্রাইভারদের বিবৃতি থেকেই বেরিয়ে আসে যে তিনি ব্যাংকের চাকরির পাশাপাশি, ব্যাংকের কোনো অনুমতি ও অবগতি ছাড়া, নিজের কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন, যা ব্যাংক চাকরিবিধি নং ২১-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই নারীর নিজ নামে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স এ সময় আমাদের হাতে আসে।

উপরের এতগুলি কারণের প্রেক্ষিতে আমি ব্যাংকের প্রশাসন প্রধান হিসেবে তাকে, আগেই যেমন বলেছি, ২১ জানুয়ারি অন্য চাকরি খুঁজতে বলি। এরপর থেকে তিনি অফিসে আসা বন্ধ করে দেন এবং এক পর্যায়ে অফিস থেকে ‘আনঅথরাইজড অ্যাবসেন্সের’ কারণে তার চাকরি ২০১৯-এর মে মাসের শুরুতে ‘শূন্য’ হয়ে যায়। তারপর ব্যাংক থেকে চিঠি যায় তার হোম লোন ও অন্যান্য লোন পরিশোধ করার বিষয়াদি নিয়ে।

এরই পরে আজকের এই মামলা, যার প্রথম ‘আসামি‘ আমি। অন্যদিকে থানা তার মামলা নেয়ার আগের দিন তিনি আমাদেরকে বলেন যে তাকে ৫ কোটি টাকা দেওয়া হলে তিনি এ মামলা করবেন না। তার এই ব্ল্যাকমেইলিং প্রচেষ্টাকে শক্তপোক্ত করতে তিনি তার কথোপকথনে দেশের কজন মানী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম নিয়ে ব্যাংককে ভয়ও দেখান। ব্যাংকের কাছে তার এই পুরো কথোপকথনের স্পষ্ট অডিও রেকর্ডিং আছে যা এখন তদন্তে একটি বড় আলামত হয়ে উঠবে বলে আমার ধারণা।

পাঠকদের উদ্দেশে এর বেশি কিছু বলার নেই আমার। ৫,০০০ কর্মীর এ ব্যাংকটির আমি প্রশাসন প্রধান। আমাকে বড় কিছু নিয়মকানুন ভঙ্গকারী এক এমপ্লয়ির বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থাই নিতে হয়েছে। শক্ত হাতে প্রশাসন চালাতে হলে আমার পক্ষে এর ব্যত্যয় ঘটানোর কোনো বিকল্প ছিল না। তার অভিযোগে আছে যে আমি তাকে হয়রানি করেছি তিনি ব্যাংকে ঢোকার পর থেকে, মানে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর, যখন আমি ব্যাংকের এমডি বা এএমডি বা ডিএমডি বা অমন কিছু না, কোনো উচ্চপদস্থ কেউ না। তবে তিনি কিন্তু তখনও এক ডিএমডি-র পি.এস., এবং পরে ২০১৩-র নভেম্বর থেকে এমডির পি.এস.। 

তো, এতগুলি বছর তিনি এমডির পি.এস.-এর মতো এক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেন আর প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্তাব্যক্তিকে এসব কথা কোনোদিন বলতে পারলেন না? আরও কথা হচ্ছে তিনি চাকরি করতেন সিটি ব্যাংকে, যেখানে নারী নিপীড়ন/হয়রানির ব্যাপারে ব্যাংকের বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ চিরকালই ক্ষমাহীন। সেই ব্যাংকের একজন নয়, তিন তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিষয়ে তার কথাগুলি তিনি জানাচ্ছেন এত বছর পরে, আমার হাতে তার চাকরিচ্যুতি হবার পরে?

কেউ একজন বলল ‘যৌন নিপীড়ন‘, আর অমনি তা হয়ে গেল? কোনো সাক্ষীপ্রমাণ, বিন্দুমাত্র কোনো প্রমাণ, অন্তত কোনো ‘সারকামস্টানসিয়াল এভিডেন্স,‘ অন্তত তার কোনো প্রাক্তন সহকর্মী বা বন্ধুকে বলা তার কোনো কথা, এ-বিষয়ে তিল পরিমাণ কোনো নালিশ—কিছু একটা তো থাকতে হবে, নাকি? আর ক্রিমিনাল মামলা যিনি করবেন, ফেনীর ঘটনাউত্তর দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নারী নিপীড়ন নিয়ে যিনি মামলা করবেন, তিনি কেন সেই মামলা করা বা না করার শর্ত হিসেবে হুমকি দিয়ে আর্থিক বেনিফিট আগে চাইবেন? এর নাম নিজের মর্যাদার জন্য এক নিপীড়িত নারীর লড়াই? আর তিনজন সিনিয়র কর্মকর্তা তাকে নিপীড়ন করলেন যে ব্যাংকে, সেখানে তো তবে রীতিমতো নষ্ট সংস্কৃতি। কিন্তু তার সেই কথোপকথনে দেখা যাচ্ছে তিনি আবার সেই একই ব্যাংকে কাজ ফিরে পেতে মরিয়া। এ কেমন কথা?

লেখালেখির জগতে আমি যাদের অপছন্দের, তারা এ-প্রসঙ্গে একজন ব্যাংক এমডি-র ‘ক্ষমতা‘ বনাম এক সাধারণ নারীর আর্তির গল্পও তুলে ধরছেন। এর চেয়ে বড় ভুল আর নেই। আমিও সাধারণ এক মানুষ, যে স্রেফ তার কাজের গুণে আজ এই দায়িত্বে, এদেশে যার কোনো বড় প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজনের থেকে পাওয়া কোনো নিরাপত্তা ব্যাকআপ নেই এবং এই দ্রুত-বর্ধনশীল অর্থনীতির নানা মোচড় ও চিৎকারের মধ্যে ব্যাংক এমডি-র চেয়ারের মতো এক ‘মিউজিক্যাল চেয়ারে‘ বসে যে কিনা সারাদিনের খেয়োখেয়ি, রণদামামা ও বিধিবিড়ম্বনার হাতে হিমশিম খাওয়ার পরে দিনশেষে তার বাসার লাইব্রেরি রুমে ওসিপ মান্দেলশ্তাম কি বিষ্ণু দে-র বই হাতে নিয়ে একা, নিঃসঙ্গ, সবরকমের ক্ষমতাহীন—এ-পৃথিবীর সর্বব্যাপী পুড়িয়ে-ভষ্ম-করে-দিতে-চাওয়া তীব্র ষড়যন্ত্রপরায়ণ রোদের সামনে নগ্ন, উন্মুক্ত।

শেষ কথা। একদিকে ওই দৈনিক পত্রিকা আমাকে নারী নির্যাতক বানিয়ে ছাড়ল; অন্যদিকে কিছু কবি-লেখক নামধারী রাক্ষসেশ্বর, লঙ্কাধিপতি কোনোকিছু না বুঝে না জেনে আমার লেখকসত্তাপ্রসূত আত্মমর্যাদার দিকে তীর ছুঁড়ল; এবং অন্য আরেকদিকে আমার ওই প্রাক্তন নারী সহকর্মীর ব্যক্তিজীবন নিয়ে অনেকগুলি পত্রিকা অশালীনতার দিগন্তবিস্তৃত দানবিক থাবাটি দেখাল। আমি এ তিনটি জিনিসেরই তীব্র নিন্দা জানাই। এর কোনোটিই ভালো নয়। আজ দুটি তরবারি আমার দিকে, একটি তার দিকে। কাল এই তরবারিই ঘুরবে আপনার দিকে এবং আপনার স্ত্রী বা কন্যার দিকে।

কলহের নীতিমালা মানার উপরেই দাঁড়িয়ে আছে সভ্যতা ও অসভ্যতার ভেদরেখা—এরকমই বলেছিলেন মহান কবি জোসেফ ব্রডস্কি। সেই নীতিমালা মানতেই হবে, স্রেফ মিনিমাম শালীনতায় চলবে না; আক্রমণ ও আত্মরক্ষা—দু ক্ষেত্রেই যথেষ্ট শালীনতা বজায় রাখতেই হবে। আমরা সবকিছু এভাবে জাতিভ্রষ্ট দুরাত্মাদের হাতে ঠেলে দিতে পারি না। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘কোথাকার তরবারি কোথায় রেখেছে‘। জাতি হিসেবে এবং ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে সিচুয়েশন বিশেষে তরবারি শরীরের সঙ্গে থাকতেই পারে, কিন্তু তা খাপেই রাখতে হবে।

না, এর বেশি কিছু বলার নেই আমার। বাকি বিচার, বিবেচনার ভার রইল আপনাদের বিবেকের ওপরে। আমি শুধু জানি, আমি কোনো অন্যায় করিনি। অধিকাংশ মানুষের মতোই আমার আছে অনেকটুকু গুণ আর অল্পটুকু ত্রুটি। সেই ত্রুটির তালিকায় বহু কিছু থাকতে পারে, কিন্তু কখনোই কোনো মেয়েকে হয়রানি বা নিপীড়ন করা নয়। অসম্ভব সেটা।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে মনিরা সুলতানা পপির সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

মনিরা সুলতানা পপি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান বলেন, ‘পপির ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবির বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশিকিছু বলতে চাই না।’

ব্রেকিংনিউজ/টিটি/এমআর