বারবার পুলিশ কেন জঙ্গি টার্গেটে?

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ০৪:৫২ আপডেট: ১০:০০

বারবার পুলিশ কেন জঙ্গি টার্গেটে?

> সন্ত্রাস জঙ্গিবাদকে রুখে দিয়েছে সে কারণেই পুলিশ টার্গেটে
> পুলিশের মনোবল দুর্বল করতেই হামলা
> জনমতে ভীতি ছড়ানোর জন্যই পুলিশের ওপর হামলা
> দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য হামলা

দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা পুলিশকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে ইসলামী জঙ্গিরা। রাজধানীতেই গত পাঁচ মাসে পুলিশকে লক্ষ্য করে তিনটি বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের মনোবল ঘায়েল করতে আইএসের নাম ভাঙিয়ে জঙ্গি কিংবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই বোমা হামলাগুলো চালাচ্ছে বলে দাবি পুলিশের। পুলিশকে টার্গেট করার পাশাপাশি দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি চক্র এর নেপথ্যে কাজ করছে বলেও মনে করা হচ্ছে। 

সর্বশেষ সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল হামলার ঘটনা ঘটেছে। বরাবরের মতো এ ঘটনায়ও হামলার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এর আগে, গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তান ও ২৬ মে মালিবাগেও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

সাইট ইন্টেলিজেন্স জানায়, ঢাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে অত্যাধুনিক আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে আইএস। এতে দুই পুলিশ আহত হয়েছে।

শনিবার রাতের হামলায় আহতরা হলেন- এএসআই শাহাবুদ্দিন (৩৫) ও কনস্টেবল আমিনুল (৪০)। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেলটি কোন পাশ থেকে ছোড়া হয়, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি ঘটনাস্থলে থাকা সন্ত্রাস দমন বিষয়ক পুলিশের বিশেষ ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের সদস্যরা। 

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘আমরা আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করবো। এছাড়া ঘটনার সময় আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি। ধারণা করছি, ফুটওভার ব্রিজের ওপর থেকেই ককটেলটি নিক্ষেপ করা হয়েছে।’

পুলিশকে টার্গেট করে এই হামলা চালানো হয় বলে ঘটনার পরপরই মন্তব্য করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিদায়ী কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া।

হামলার ঘটনা পরিদর্শন শেষে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি, জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার ও পুলিশের মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্য এই হামলা হতে পারে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাতে তৈরি বোমা বা আইইডি বিস্ফোরণে পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়েছেন। এরআগে রাজধানীর মালিবাগ ও গুলিস্তানের পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলার সঙ্গে এবারের ঘটনার সামঞ্জস্যতা রয়েছে।’

দেশে বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় অনেকগুলো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটলেও এসব হামলায় সরাসরি শুধুমাত্র পুলিশকে টার্গেট করা হয়নি। কিন্তু ইদানিং কৌশল পাল্টে পুলিশের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালাচ্ছে জঙ্গিরা। সে হামলার দায়ও স্বীকার করছে তারা। প্রশ্ন উঠেছে, বারবার পুলিশকে কেন টার্গেট করেছে জঙ্গিরা? নিরাপত্তা, সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার সফল অভিযানে বিপর্যস্ত জঙ্গিরা পুলিশকে টার্গেট করে প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চাইছে।

এ ব্যাপারে পুলিশের একধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, জঙ্গিরা পুলিশকে টার্গেট করেছে এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। 'লোন উলফ' (কাপুরুষের মতো রাতের আঁধারে নিরীহদের ওপর আক্রমণকারী) জঙ্গিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টার্গেট করে হামলার সুযোগ খুঁজছে এমন তথ্যের পর বাড়তি সতর্ককতা জারি করা হয়। এর মধ্যেই বোমা পুঁতে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। 

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধতা এটা চালু যারা করতে চায়, তারা পুলিশকে প্রতিপক্ষ মনে করে হামলা চালাচ্ছে। এসব বন্ধে পুলিশ প্রধান ভূমিকা রাখে। সুতরাং পুলিশের ওপর হামলা করবে এটা তো স্বাভাবিক। এতে পুলিশের মনোবল ভেঙে গেলে এবং ভয়ভীতি পেলে এসব অপরাধীদের কাজ করা সুবিধা হয়।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলা চালায় কারা- যারা রাষ্ট্রের শত্রু। এটা তো নতুন ঘটনা না। ২০১৩ সালে জামায়াত এবং তাদের ক্যাডারবাহিনী পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছিল। চোরাগুপ্তা বা বোমা নিক্ষেপ চালিয়েছিল এবং বন্দুক দিয়ে পিটিয়েছিল।’

এরআগে গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তানে একটি পুলিশ বক্সে একই ধরনের হামলা হয়েছিলো। এতে ট্রাফিক কনস্টেবল নজরুল ইসলাম (৩৭), লিটন (৪২) ও কমিউনিটি পুলিশ মো. আশিক (২৮) আহত হন। এ সময় গুলিস্তানের ডন প্লাজার সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন পুলিশের দুই সদস্য। হঠাৎ একটি শক্তিশালী ককটেল তাদের সামনে পড়ে এবং বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। সেই হামলার দায়ও স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী।

মালিবাগে যে গাড়িতে বিস্ফোরণটি ঘটেছিলো সেটি পুলিশের বিশেষ শাখা এসবি'র একটি পিক-আপ ভ্যান। যেখানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিলো, তার পাশেই ছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি ও এসবির প্রধান কার্যালয়। মালিবাগে বোমা হামলার ঘটনায়ও ট্রাফিক পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদা আক্তার বাবলী (২৮) ও রিকশাচালক লাল মিয়া (৫৫) আহত হন।

এছাড়া ২৩ জুলাই রাতে রাজধানীর পল্টন মোড় ও খামাড়বাড়ি পুলিশ বক্সের কাছে ফেলে রাখা বোমা উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনার পর দায় স্বীকার করে আইএসের নামে বিবৃতি দেওয়া হয়।

প্রতিটি হামলার পর পরই আইএস'র দায় স্বীকার সম্পর্কে সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা ব্রেকিংনিউজকে জানান, দেশে কোনও সন্ত্রাসী হামলা হলেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপে বলা হয়- আইএস দায় স্বীকার করেছে। আগের ঘটনাগুলোর তদন্ত করে আইএস'র কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। সায়েন্স ল্যাবরেটরির ঘটনাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। 

আইএস’র দায় স্বীকার সম্পর্কে পুলিশ কী বলছে? এই হামলায় আইএস’র সম্পৃক্ততার বিষয় সম্পর্কে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে পুলিশ সদর দফতর থেকে।

তারা বলছে, হামলার বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং আইএস’র দায় স্বীকারের বিষয়টিও পুলিশের দৃষ্টিতে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত ঘটনার সাথে আইএস'এর কোনও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

ব্রেকিংনিউজ/টিটি/এমআর

bnbd-ads