৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে ডেঙ্গু রোগী, মৃত্যুর সংখ্যা অনিশ্চিত

রাহাত হুসাইন
৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
প্রকাশিত: ০৬:০২ আপডেট: ১০:৫৮

৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে ডেঙ্গু রোগী, মৃত্যুর সংখ্যা অনিশ্চিত

  •  জ্বর হলেও ডেঙ্গু পরীক্ষার চাপ
  •  আতঙ্ক ছড়িয়েছে ডেঙ্গু রোগীতে মৃত্যুর সংখ্যা
  • বেসকারি হিসেবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি
  • এবার বর্ষা শুরুর আগেই দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ

চলতি বছরের ডেঙ্গু ছাড়িয়ে অতীতের সব রেকর্ড। সবচেয়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ডেঙ্গু রোগীতে মৃত্যুর সংখ্যা। চলতি বছরে ১৯২টি মৃত্যুর তথ্য পেলেও ৯৬টি ঘটনার পর্যালোচনা সমাপ্ত করে ৫৭টি মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর)। সরকারি হিসেবে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। যদিও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

চলতি বছরের আগস্ট থেকেই দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু মহামারী। সকল শ্রেণি-পেশা ‍ও নানা বয়সের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এডিশ মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু জ্বরে। ডেঙ্গু থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশু ও নারীরাও। দেশের এমন কোনো জেলা নেই যেখানে ডেঙ্গু রোগীর খবর পাওয়া যায়নি। ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু রোগী। 

প্রতিবছরই বর্ষাকালে বাড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ। তবে ২০১৯ সালে বর্ষা শুরু হওয়ার আগে-ভাগেই দেশে মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু। এ বছর ডেঙ্গু নিয়ে আগেভাগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাড়তি সতর্কতার কথা বললেও আমলে নেয়নি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নগরের দুই সিটি করপোরেশন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সরাসরি মনিটরিং করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর ডেঙ্গু মোকাবেলায় সমন্তিত ভাবে কাজ করার তাগিদ দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

কোরবানির ঈদের ছুটিতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমে আসলেও ছুটি কাটিয়ে কর্মব্যস্ততার সাথে সাথে আবারও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও। শনিবারও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ৬০৭ নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালসহ রাজধানীর হাসপাতালগুলোত প্রায় একই হারে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।

ডেঙ্গু রোগবাহিত এডিস মশা নির্মূলে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এজন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে লার্ভা অনুসন্ধান, চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। পাশাপাশি এডিস মশা ও লার্ভা নিধনে নতুন ওষুধও প্রয়োগ করছে সিটি করপোরেশন।

শনিবার (৭ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নতুন রোগীদের মধ্যে রাজধানীতে ভর্তি হয়েছেন ২৩৩ জন। এছাড়া ঢাকায় বাইরে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৩৭৪ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী ৩ হাজার ৪৪৭ জন। তাদের মধ্যে ঢাকার ৪১টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৭১৯ জন এবং অন্যান্য বিভাগে সর্বমোট ১ হাজার ৭২৮ জন ভর্তি আছেন।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত (৭ সেপ্টেম্বর) ৭৫ হাজার ৭৫৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন ৭২ হাজার ১১৪ জন।

এখন পর্যন্ত রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) ডেঙ্গু সন্দেহে ১৯২টি মৃত্যুর তথ্য পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সংস্থাটি ৯৬টি ঘটনার পর্যালোচনা সমাপ্ত করে ৫৭টি মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যেকোনও জ্বর হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে রোগী ও স্বজনরা চাপ দিতে থাকেন। এজন্য হাসপাতালগুলোর ল্যাবগুলোতে দীর্ঘ ভিড় দেখা গেছে। রোগীর স্বজনদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, জ্বর হলেই ভয় চেপে বসে ডেঙ্গু হয়েছে কিনা?। তাই ডাক্তারও ডেঙ্গু শনাক্তের জন্য পরীক্ষা দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স ডিপার্টমেন্টের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১টি আবাসিক হলে থাকেন তিনি। ১ সেপ্টেম্বর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ৪ দিন চিকিৎসা নেন তিনি। জ্বর ভালো না হওয়ায় ৫ তারিখে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার মোট ৪টি সিবিসি বা কমপ্লিট ব্লাড টেস্ট পরীক্ষা করা হয়েছে। ৪টি পরীক্ষা করেও ডেঙ্গু ধরতে পড়েনি। তবুও তাকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি করে রাখা হয়েছে।

অসুস্থ মিজানুর রহমান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘এখন তো জ্বর হলেই সবাই মনে করে ডেঙ্গু। এখন ডাক্তারও চেষ্টা করছে রোগ ধরতে। তবে ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে আমাকে।’

মুন্সিগঞ্জের ভবেরচর থেকে স্বামী সোলাইমানকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন নাজমা বেগম। নাজমা বেগমের স্বামী সোলাইমান ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। গত সোমবারে সোলাইমানের জ্বর হওয়ায় স্থানীয় একটি ক্লিনিকে এনএস-১ পরীক্ষা করান। ডেঙ্গু ধরা পরায়, পরদিন মঙ্গলবার তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে। সেখানে সোলাইমানের চিকিৎসা চলছে।

৫ দিন আগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয় জুরাইনস্থ মুরাদপুর হাই স্কুলের শিক্ষার্থী ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী শান্ত রহমান। জ্বর হওয়ার ২ দিন পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। রক্ত পরীক্ষা করার পর ডেঙ্গু ধরার পড়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করান তার মা সালেহা রহমান।

সালেহা রাহমান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘শান্ত ৯ম শ্রেণিতে পড়ে। জ্বর হওয়ার ২দিন পর তাকে এখানে (ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) নিয়ে আসি। জ্বরের কারণে ছেলের পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটবে। আমি ডেঙ্গু আতংকে ভুগছি না, আমার ছেলের সুস্থ্যতা নিয়ে টেনশনে আছি।’

ব্রেকিংনিউজ/ আরএইচ/ এসএ / এমজি

bnbd-ads