কে হচ্ছেন ছাত্রদলের কাণ্ডারী- শ্রাবণ নাকি হাফিজ? সম্পাদকে এগিয়ে যারা

এস এম আতিক হাসান
৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
প্রকাশিত: ০৯:৩১ আপডেট: ০৪:৪২

কে হচ্ছেন ছাত্রদলের কাণ্ডারী- শ্রাবণ নাকি হাফিজ? সম্পাদকে এগিয়ে যারা
ছবিতে বাঁ দিক থেকে (উপরে) শ্রাবণ, হাফিজ, মামুন ও খোকন; বাঁ দিক থেকে (নিচে) মোস্তাফিজ, ডালিয়া, তানজিল ও জু্য়েল

দীর্ঘ ২৭ বছর পর কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে বিএনপির ভ্যানগার্ড খ্যাত ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। সংগঠনটির ষষ্ঠ কাউন্সিল আর মাত্র ৫ দিন পর। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। নতুন অভিভাবক পাবে ছাত্রদল। এবারের কাউন্সিলকে ঘিরে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা। এর মধ্যে সবচেয়ে কদর বেড়েছে তৃণমূল নেতাদের। ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের ঘোষণার পর থেকেই আগ্রহী প্রার্থীরা যাচ্ছেন তৃণমূল নেতাদের দরোজায়। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, জেলা ও মহানগরের শীর্ষ নেতা ও ভোটারদের কাছে ভোট এবং দোয়া চাইছেন প্রার্থীরা। তৃণমূল নেতারাও প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন।

খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনসহ বিগত দিনে রাজপথে ছিলেন কিনা কিংবা কাদের কী ভূমিকা- এসব বিচার-বিশ্লেষণ করে তারা পছন্দের যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে চাইছেন। কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এ দুটি পদে সারা দেশের ৫৩৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নির্বাচিত করবেন আগামী দিনের নেতৃত্ব। শীর্ষ এই দুটি পদের মধ্যে সভাপতি পদে ৮ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ১৯ জন বৈধ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। যাদের বেশিরভাগই ছাত্ররাজনীতির তীর্থস্থান খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন।

ছাত্রদলের কাউন্সিলের বৈধ প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে প্রচার-প্রচারণা। প্রার্থীরা ছুটছেন এক জেলা থেকে আরেক জেলার ভোটারদের কাছে। তাদের কাছে তুলে ধরছেন ছাত্রদলের জন্য নিজের ত্যাগ, রাজপথে ভূমিকা, সংগঠন পরিচালনায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। প্রতিশ্রতি দিচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন জোরদার করার। অনুরোধ জানাচ্ছেন প্রত্যেক প্রার্থীর বিষয়ে (ব্যক্তিগত ও পারিবারিক) খোঁজ-খবর নিয়ে, সৎ, যোগ্য, রাজপথে থেকে আন্দোলনকারীকে ভোট দেয়ার জন্য।

এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রার্থী নিজে এবং তার কর্মীরা চালাচ্ছেন প্রচারণা। অতীতে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেদের অংশগ্রহণ, প্রতিপক্ষের মাধ্যমে হামলা, মামলার শিকার হওয়া ছবিও ছড়িয়ে দিচ্ছেন ডিজিটাল দুনিয়ায়। যেখানে দলটির নেতাকর্মী, ভোটার সকলেই জানাচ্ছেন শুভকামনা। এছাড়া মুঠোফোনে এসএমএস, কল দিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেও দেখা যাচ্ছে প্রার্থীদের।

সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন ৮ জন। তাদের মধ্যে প্রভাবশালী নেতা সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর আস্থাভাজন কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ।যশোরের সন্তান শ্রাবণ বর্তমান ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন।তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে।

শ্রাবন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেন থেকে আন্দোলনে-সংগ্রমে রাজপথে আছি। বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত হয়েছি, গ্রেপ্তার হয়েছি।ছাত্রদল করার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। বাবার সাথে যোগাযোগ নেই। বার বার হামলা, মামলা, কারাবরণের শিকার হয়েছি।ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলকে ঘিরে আমি বিভিন্ন জেলা সফর করছি। কাউন্সিলরদের কাছে গিয়ে ভোট চাচ্ছি। তারা আমাকে আশ্বস্ত করছেন।’ তিনি আশা করছেন দলের কাউন্সিলররা তার ত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করে তাকে ভোট দিবেন। জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী এই ছাত্রনেতা।

আরেক প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজের আস্থাভাজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বাগেরহাটের সন্তান হাফিজুর রহমান ছাত্ররাজনীতির কারণে বারবার হামলার শিকার হয়েছেন। ১/১১’র সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। বিগত সব আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় থেকেছেন। সভাপতি পদে প্রার্থী হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন ভোটারদের কাছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, কাউন্সিলদের প্রত্যক্ষ ভোটে, সুন্দর প্রতিযোগিতা, উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে যে নেতৃত্ব বেড়িয়ে আসবে সেই নেতারা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন আরো বেগবান করবে। তিনি নির্বাচিত হলে সংগঠনকে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী করে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে চান। এছাড়া প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্রদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে চান।

সভাপতি পদে লড়ছেন মামুন খান। শুরুতে তার প্রার্থিতা বাতিল হলেও আপিলের মাধ্যমে তা ফিরে পেয়েছেন সদ্য বিলুপ্ত কমিটির এই সহ তথ্য সম্পাদক। জানা যায়, প্রার্থীদের মধ্যে বিগত আন্দোলন সংগ্রামে মামুন খান সবচেয়ে বেশি কারা নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন। তাই সাধারণ কর্মীদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। মামুন প্রার্থীতা ফেরত পাওয়ায় কাউন্সিলের হিসাব-নিকাশ অনেকটাই পাল্টে গেছে বলে মনে করেন তৃণমূলের কাউন্সিলররা।

উত্তরাঞ্চলের বিএনপির নেতাদের আস্থাভাজন বগুড়ার ফজলুর রহমান খোকন- সিন্ডিকেট ও আঞ্চলিক দুই হিসেবেই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। জয়ের ব্যাপারে তিনি ও আশাবাদী। এছাড়াও সভাপতি পদে লড়ছেন জামালপুরের সাজিদ হাসান বাবুও।

অপরদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে বৈধ ১৯ জন প্রার্থীর মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল (ডাকসু) নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী হিসেবে অংশ নেয়া নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার গোপালপুর গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান।

মোস্তাফিজুর রহমান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে দল আমাকে সংগঠনের পক্ষ থেকে নির্বাচন করার সুযোগ দিয়েছিলো। কিন্তু সেই নির্বাচনে সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের বিজয়কে ছিনিয়ে নেয়।’

তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেয়ার কারণে সারা দেশে ব্যাপক সারা পাচ্ছি। আশা করি কাউন্সিলররা নীরব ভোটের মাধ্যমে আমাকে বিজয়ী করবে। আর আমি নির্বাচিত হলে সংগঠনকে আন্দোলনমুখী করতে ঢেলে সাজাবো। বাংলাদেশের হারানো গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করবো। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির আন্দোলন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য রাজপথে কার্যত জোড়ালো আন্দোন গড়ে তুলবো এবং বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম আহ্বয়ক ও বরিশাল (পটুয়াখালী) অঞ্চলের প্রার্থী তানজিল হাসান। তিনিও ১/১১’র স্বৈরাচার সরকার হটাও আন্দোলন থেকে শুরু করে বিএনপি ও ছাত্রদল ঘোষিত সকল আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। 

তানজিল হাসান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘আমি সবসময় আন্দোলনের জন্য রাজপথে ছিলাম। ১/১১, ১৩ এবং ১৪ সালে সবসময় রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। এজন্য আমাকে বারবার ছাত্রলীগ এবং পুলিশের হাতে নির্যাতিত হতে হয়েছে। রাজপথে আন্দোলনে থাকার কারণেই বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। আশা করি কাউন্সিলরা এটা বিবেচনা করবেন। আমি নির্বাচিত হলে সংগঠনকে গতিশীল করার জন্য তৃণমূল থেকে সকল ইউনিটের কার্যক্রম শেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন জোড়ালো করবো।’

বরিশালের আরেক প্রার্থী সাইফ মাহমুদ জুয়েলও বেশ আলোচনায় রয়েছেন। তার প্রার্থিতা বাতিলসহ নানা নাটকীয়তার পর তিনি প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে প্রচারণায় ব্যস্ত রয়েছেন। জুয়েল বলেন, ‘আমি তৃণমূল থেকে ছাত্রদল করে আসছি। বিগত আন্দোলনে আমি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি। আমি রাজপথে কর্মসূচিতে থাকার করণে গুলিবিদ্ধ হয়েছি, বারবার কারাবরণ করেছি। আমার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। আমি আশা করি তৃণমূল আমাকে প্রাধান্য দেবে। আগামী দিনে রাজপথে সবাইকে নিয়ে জোড়ালো আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-সভাপতি সাতক্ষীরার সন্তান আমিনুর রহমান আমিন। প্রতিদ্বন্দিতা করছেন সাধারণ সম্পাদক পদে। বৃহত্তর খুলনার সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হিসেবে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। এই পদে যে কয়জন প্রার্থী আলোচনায় রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম আমিন সারা দেশে ছুটে বেড়াচ্ছেন। কাউন্সিলরদের কাছে তার কর্মকান্ড তুলে ধরে নিজের জন্য ভোট চাইছেন। ভোটারদের কাছ থেকেও তিনি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন বলে জানান।

বিএনপির অন্যতম ঘাটি হিসেবে পরিচিত নোয়াখালী জেলার ছেলে শাহ নাওয়াজ। সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী শাহ নাওয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে ভোট পেতে ভোটারদের কাছে ছুটছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘কাউন্সিলররা দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে পরীক্ষা দিয়ে নেতা হয়েছেন। তারা জানেন রাজপথে কাদের ভূমিকা রয়েছে, কাদেরকে নেতৃত্বে আনলে খালেদা জিয়ার ও গণতন্ত্রের মুক্তি আন্দোলন জোরদার হবে।’ তারা তাদেরকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন বলে তিনি মনে করেন।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রথম নারী সাধারণ সম্পাদক হতে চান ডালিয়া রহমান। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কোথাও গেলে তার গাড়িবহরের সঙ্গে স্কুটি নিয়ে থাকতেন ডালিয়া। তিনি খালেদা জিয়ার ‘স্কুটি সঙ্গী’ হিসেবে রাজনৈতিক মহলে পরিচিত। ব্রেকিংনিউজকে ডালিয়া রহমান বলেন, ‘আমি প্রচারণায় বর্তমানে ময়মনসিংহে আছি। তৃণমূলে অকল্পনীয় সারা পাচ্ছি। আশা করি জয় লাভ করতে পারবো।’

এছাড়াও এই ষষ্ট কাউন্সিলে সম্পাদক পদে লড়ছেন, মো. জাকিরুল ইসলাম জাকির, মোহাম্মদ কারিমুল হাই (নাঈম), মাজেদুল ইসলাম রুমন, শেখ আবু তাহের, সাদিকুর রহমান, কেএম সাখাওয়াত হোসাইন, সিরাজুল ইসলাম, মো.ইকবাল হোসেন শ্যামল, মুন্সি আনিসুর রহমান, মো. মিজানুর রহমান শরিফ, শেখ মো.মশিউর রহমান রনি, সোহেল রানা ও কাজী মাজহারুল ইসলাম।

ব্রেকিংনিউজ/এএইচ/এমআর