শিরোনাম:

ফটিকছড়িতে ভয়াবহ বন্যা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৩ জুন ২০১৮, বুধবার
প্রকাশিত: 3:45
ফটিকছড়িতে ভয়াবহ বন্যা

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি জুড়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। তিন দিনের অবিরাম বৃষ্টি ও হালদা-সর্তা-ধুরুং খালের বাঁধ ভেঙে পরিস্থিতি ক্রমে অবনতির দিকে এগোচ্ছে। উপজেলার প্রায় ১২ টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভার প্রায় অর্ধশত গ্রাম বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে অর্ধশত গরু-ছাগল। নষ্ট হয়েছে আমন ধানের বীজতলা ও পুকুরের মাছ। 

এদিকে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন স্কুল-কলেজে বন্যা দুর্গত মানুষের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে এবং সার্বক্ষনিক একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছে বলে জানা গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নারায়ণহাট গেজ স্টেশন কর্মকর্তা খুরশিদ আলম জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পানির লেভেল ১৬.৮৬ সেন্টিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে। হালদা নদীর পানি ৫.৯০ সেন্টিমিটার, যা বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ২৬৫.০ মিলি মিটার রেকর্ড হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, উপজেলার ধর্মপুর, কমিটি বাজার, বখতপুর, সমিতিরহাট, নিচিন্তাপুর, আজাদী বাজার, পশ্চিম ধর্মপুর, লেলাং, গোপাল ঘাটা, কাঞ্চন নগর, মানিকপুর, তেলপারই, মানিক গোলা, পশ্চিম বখতপুর, ওখাড়া, রোসাংগীরি, পশ্চিম নানুপুর, মাইজভান্ডার, আজিমনগর, সুয়াবিল, সুন্দরপুর, পূর্ব হারুয়ালছড়ি, পাইন্দং, ভেড়াজালী, শেতকুয়া, দৌলতপুর, কুম্বার পাড়, ধুরুং, রাঙ্গামাটিয়া এলাকা সহ প্রায় ৫০টি গ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে আছে। 
এখানকার প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে নৌকা যোগে যোগাযোগ করতে হচ্ছে এবং বিশুদ্ধ পানি ও খাবার অভাব দেখা দিয়েছে। ধানের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। হাঁস-মুরগি ও গবাধি পশু নিয়ে বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের দুর্ভোগের সীমা নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক, গহিরা-ফটিকছড়ি সড়ক, নাজিরহাট মাইজভান্ডার সড়ক, ফটিকছড়ি-হেয়াকো সড়ক, নাজিরহাট-কাজীরহাট সড়ক সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজার পানির নীচে তলিয়ে গেছে। দৌলতপুরের সমাজকর্মী মাহফুজ আনাম জানান, তার এলাকার বাড়ি-ঘর ও মসজিদে পানি ঢুকেছে। এতে আশ্রয় নেয়া লোকজন মসজিদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

নানুপুর লায়লা কবির ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আনম সরোয়ার আলম জানান, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে তার কলেজের বাণিজ্য ভবনে প্রায় পাঁচ শতাধিক বন্যা দুর্গত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য কলেজ প্রতিষ্ঠাতা পরিবার খাবারের ব্যবস্থা করেছে।

কাঞ্চন নগর ইউপি চেয়ারম্যান রশিদ উদ্দিন চৌধুরী কাতেব বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় ধুরুং খালের পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমার নির্বাচনী এলাকার পুরোটাই বন্যা কবলিত হয়েছে। ধুরুং খালের সিংহ চরে আটকা পড়েছিল এক কৃষক পরিবারের নারী-শিশু সহ ৮ জন সদস্য। তারা ঘরের চালে উঠে বসেছিল। মুঠোফোনে খবর পেয়ে তাদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস এসেও ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত এলাকার কিছু যুবক বাঁশের ভেলায় চড়ে  রাত ১২টায় তাদের উদ্ধার করে। ফটিকছড়ির ইউএনও সরেজমিনে উপস্থিত থেকে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন।

পাইন্দং ইউপি চেয়ারম্যান সরোয়ার হোসেন স্বপন বলেন, ভারী বর্ষণ, পাহাড়ী পানির ঢলে ধুরুং খালের পাড় ভেঙে ব্যাপক বন্যা সৃষ্টি হয়েছে আমার ইউনিয়নের ভেড়াজারী ও শ্বেতকুয়া এলাকায়। এতে ব্যাপক রাস্তা-ঘাট ও মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সমিতিরহাট ইউপি চেয়ারম্যান হারুন রশিদ ইমন বলেন, আমার ইউনিয়নের বিশাল এলাকা এখন পানির নিচে ডুবে আছে। এলাকার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। নৌকা, কলা গাছ ও বাঁশের ভেলা ছাড়া যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না।  হাঁস-মুরগি, ছাগল ও গবাদি পশু নিয়ে মানুষ বেশ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

ধর্মপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, সর্তা খালের ভেড়ী বাঁধ ভেঙে ধর্মপুর কমিটি বাজার, পর্ব ধর্মপুর, আজাদী বাজার এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। এসব এলাকার হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। সোমবার রোজা রাখতে সেহেরি খেতে পারেনি অনেক পরিবার। সর্তা খালের পানি ডুকে পড়ায় শিশু-বৃদ্ধ ও গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ জায়গা খুঁজতে খুঁজতে ঘরের মৌলিক জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে অনেক পরিবারের। বন্যার পানিতে মাটির ঘর ও বেড়ার ঘর নষ্ট হয়েছে শত শত।

সুন্দরপুর ইউপি চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, বন্যা ফটিকছড়ির অপূরনীয় ক্ষতি করেছে। প্রধান প্রধান সড়ক নষ্ট হয়েছে। ফটিকছড়িতে এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ হয়নি। বৃত্তবানদের উচিত বর্ন্যা দুর্গতদের পাশে এগিয়ে আসা।

এ ব্যাপারে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার রায় বলেন, বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন স্কুল-কলেজে বন্যা দুর্গত মানুষের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে এবং সার্বক্ষনিক একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছে। বন্যা দুর্গত এলাকার জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ১০ টন চাল ও ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ দূরাবস্থার কারণে এগুলো পৌছাতে কষ্ট হচ্ছে।

এদিকে এ ধরনের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় স্থানীয় সাংসদের পক্ষ থেকে কোন ধরণের সহায়তা বা দুর্গতদের পাশে না দাঁড়ানোর কারণে দুর্গত মানুষের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নানা সমালোচনার ঝড় উঠেছে। 

ব্রেকিংনিউজ/ এমজি

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2