শিরোনাম:

রাসিকে ব্যানার-বিলবোর্ড লক্ষাধিক, বৈধ ৮৩!

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, রাজশাহী
১৩ জুন ২০১৮, বুধবার
প্রকাশিত: 5:09
রাসিকে ব্যানার-বিলবোর্ড লক্ষাধিক, বৈধ ৮৩!

রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। বুধবার (১৩ জুন) দুপুর থেকে এই তিন সিটিতে মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও জমা দেওয়া যাবে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এই তফসিল ঘোষণা করেন।

তফসিল ঘোষণার আগেই রাজশাহী নগরী ছেয়ে গেছে লাখো বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুনে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের (রাসিক) বৈধ তালিকায় রয়েছে মাত্র ৮৩টি। আগামী ৩০ জুলাইয়ের সিটি নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ এসব প্রচারপত্র ছড়িয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেয়াল লিখন ও পোষ্টার। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয় পার্টির প্রার্থী দোলনের পোষ্টার ব্যানারও সাটিয়েছে। আর এসবে সৌন্দর্য্য হারিয়েছে পরিপাটি ও দৃষ্টিনন্দন এ নগরী। 

রাসিক বলছে, রাজনৈতিক কারণেই অবৈধ প্রচারপত্র উচ্ছেদে যেতে পারছে না নগর সংস্থা। এতে প্রতি বছরই মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে সিটি করপোরেশন। 

রাসিকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে বিলবোর্ড রয়েছে ৫৩টি। এছাড়া ২২টি রোড ওভারহেড এবং ৮টি ইউনিপোল রয়েছে। এগুলোর সবগুলোই ব্যক্তিমালিকানাধীন। এর বাইরে কেবল নগরীর আরডিএ মার্কেট ফুটওভার ব্রীজ বিলবোর্ডের মালিকানা রয়েছে রাসিকের। তবে ব্যানার-ফেস্টুন নেই রাসিকের ওই তালিকায়। 

রাসিক বলছে, সিটি করপোরেশনের মডেল ট্যাক্স সিডিউল অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট বিলবোর্ডের জন্য ধার্য্য কর ১০০ থেকে দেড়শ টাকা। আর প্রতিটি ব্যানার ফেস্টুনে ১৫ দিনের জন্য কর ধরা হয়েছে ৫০০ টাকা। এছাড়া কাঠের ফ্রেমের ক্যানভাস প্রতিটির জন্য মাসে কর ৩০ হাজার টাকা। সাইজভেদে পোষ্টারের জন্য দিনে ৭ থেকে ১০ টাকা করে আদায় করার কথা। বিধি অনুযায়ী, অবৈধ বিলবোর্ড, ব্যানার-ফেস্টুরগুলোর উপর কর আরোপ করা গেলে রাজস্ব বাড়তো আরো কয়েকগুণ। 

মডেল ট্যাক্স সিডিউল অনুযায়ী গত ছয় বছরে বিলবোর্ড, ব্যানার, রোড ওভারহেড ও ইউনিপোল থেকে ৫ কোটি ১৩ লাখ ৯১ হাজার ৪৭৮ টাকা রাজস্ব আয় করেছে রাসিক। এর মধ্যে গত সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের মেয়াদের শেষদিকে (২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে) আদায় হয় ৪৭ লাখ ৮৮ হাজার ২২৮ টাকা। সিটি করপোরেশনের মডেল ট্যাক্স সিডিউল অনুযায়ী আদায় হয় এ রাজস্ব। 

এরপরের ২০১৩-২০১৪ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত আদায় হয় ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৩ হাজার ৬৫০ টাকা। মাঝে ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে রের্কড এক কোটি ৫৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করে রাসিক। এ পাঁচ বছরের মধ্যে ২৭ মাস মেয়রের দায়িত্বপালন করেন মহানগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। 

সিটি করপোরেশন আরও বলছে, নগরীর আরডিএ মার্কেট সংলগ্ন সড়কের ফুটওভার ব্রীজ বিলবোর্ড ইজারা দিয়ে আসছে রাসিক। এর মধ্যে সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের মেয়াদকালে (২০০৯-২০১৩) এখান থেকে ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৪০০ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। 

এরপর পরের কেবল দুটি অর্থবছরে ইজারা দিতে পেরেছে রাসিক। এর মধ্যে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা এবং ২০১৪-২০১৫ অর্থবছর ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় হয়। এরপর থেকে অবৈধ দখলে চলে যাওয়ায় এ বিলবোর্ড ইজারা দিতে পারেনি রাসিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে এটি ইজারা নেয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের মালিকানাধীন বারিন্দ মেডিকেল কলেজ। পরের বছর সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় মেসার্স এ্যানি এন্টারপ্রাইজ ইজারা নিয়েছিল। 



কিন্তু অবৈধ দখলে চলে যাওয়ায় চুক্তি অনুযায়ী ইজারামূল্য পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। শেষে বাধ্য হয়ে ইজারা বাতিল করে রাসিক। রাসিকের একমাত্র এ বিলবোর্ডে এখন শোভা পাচ্ছে সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের নির্বাচনী ব্যানার। ফলে নতুন করে দরপত্র আহবান করেও ক্রেতা পায়নি রাসিক। এতে বড় অংকের আর্থির ক্ষতির শিকার হয়েছে নগর সংস্থা। 

কেবল এ বিলবোর্ডই লিটনের ছবি সম্বলিত পোষ্টার ব্যানার রয়েছে তা নয়, নগরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের আরো কয়েক হাজার নির্বাচনী ব্যানার। অনেকটা বিলবোর্ড আকার দিয়ে শক্ত বাঁশের কাঠামোতে নগরীর জনগুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে টাঙানো হয়েছে ব্যানারগুলো। লিটনের ব্যানারে ঢাকা পড়েছে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর বেশকিছু বিলবোর্ড এবং রোড ওভারহেড।

এছাড়া বিভিন্ন স্থাপনা, সড়কদ্বীপ এমনকি নগরীর গাছে গাছেও ঝুলছে ব্যানার ও ফেস্টুন। এসব প্রচারপত্রে আসন্ন সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকায় ভোট চেয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এই সদস্য। লিটন নিজেই এমনকি তার পক্ষে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠন, এমনকি দলের নেতাকর্মীরা এসব প্রচারপত্র প্রদর্শন করছেন। আর এসবে ঢাকা পড়েছে নগরীর নান্দনিকতা।  

নগরীর শহীদ এএইচ কামারুজ্জামান চত্বরের সৌন্দর্য্যবর্ধন কাজের ভেতরেই মিস্ত্রী আবু সাইদ তার দল নিয়ে সাবেক মেয়র লিটনের বিশালাকার ব্যানার স্থাপন করছিলেন। তিনি বলেন, নগরীর ৩০ ওয়ার্ডে ২টি করে ৬০টি ১৫০ বর্গফুটের বিলবোর্ড আকারের ব্যানার টাঙানো হয়েছে। এছাড়া যাদুঘর মোড়, কাশিয়াডাঙ্গা মোড়, কেন্দ্রীয় ঈদগা এবং বহরমপুর মোড়ে টাঙানো হয়েছে ৩০০ বর্গফুটের ব্যানার। 

গত ২৫ এপ্রিল থেকে এসব ব্যানার টাঙানো হয়েছে নগরীতে। প্রতিটি ৭০০ টাকা চুক্তিতে ব্যানার টাঙানো ও রক্ষনাবেক্ষন করছেন আবু সাইদ। এর বাইরে নগরীর সাতটি পয়েন্টে ৩০০ বর্গফুটের ব্যানার টাঙিয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল আলম বেন্টু। টানা কয়েক বছর ধরেই বেন্টুর ব্যানার দেখভাল করছেন আবু সাইদ।

তবে গত কয়েক বছর অবৈধ বিলবোর্ড-ব্যানার অপসারণ অভিযানে নামেনি নগর সংস্থা। বিষয়টি স্বীকার করেছেন রাসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা শাহানা আখতার জাহান। তিনি বলেন,‘ তিন বছরের বেশি সময়ধরে রাসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেই। ফলে বড় ধরণের অভিযানে নামা হয়নি নগর সংস্থার। তবে মাঝেমধ্যেই ছোটখাট অভিযান চালিয়েছেন তারা।’ নগরীর রাজনৈতিক প্রচারপত্র অপসারণ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা।   
নগরীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থানা অবৈধ প্রচারপত্রের বড় অংশ সাবেক রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের। এতে নগর সংস্থা রাজস্ব হারানোর বিষয়টি বলে স্বীকার করেন লিটন। তিনি বলেন, ‘এনিয়ে তেমন কোন নীতিমালা নেই। এবার সিটি মেয়র নির্বাচিত হলে রাসিকের রাজস্ব বৃদ্ধিতে নীতিমালা প্রণয়ন করবো।’ 

এসব প্রচারপত্রে নগরীর নান্দনিকতা হারাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে, নগরীর চেহারাটা পাল্টে দেয়া সাবেক এই মেয়র বলেন, ‘সামনে নির্বাচন। আর বিষয়টি রাজনৈতিক। তাছাড়া এগুলো নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন। তাই এনিয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে চাই না।’ 

অবৈধ বিলবোর্ড-ব্যানার অপসারণে ঈদের আগেই বড় ধরণের অভিযানে নামার কথা জানিয়েছিল রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তিনি বলেন, ‘অবৈধ ব্যানার-বিলবোর্ডের পুরোটাই রাজনৈতিক। নগরীর পরিচ্ছনতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই চালানো হবে ওই অভিযান। তবে এখনো তিনি পদক্ষেপ নেননি।’

অবৈধ বিলবোর্ড-ব্যানার ট্যাক্সের আওতায় নেয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি করা গেলে রাসিকের রাজস্ব বাড়তো। কিন্তু এটি করা সম্ভব নয়। কারণ-সারা দেশই আজ ডাকাতের দেশ। এনিয়ে রাসিক কঠোর অবস্থানে গেলে নগরজুড়ে অরাজকতা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেবে দখলদাররা।’

মেয়রের অভিযোগ, সম্প্রতি আরডিএ ফুটওভার ব্রীজসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোদ রাসিকেরই ব্যানার-ফেস্টুন সরিয়ে নির্বাচনী বার্তা টাঙিয়েছে আগ্রাসী আওয়ামী লীগ। যদিও রাসিকের ওই প্রচারপত্রে নগরবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছাসহ নাগরিক বার্তা দিয়েছিলেন মেয়র। এ ঘটনায় চরম ক্ষুদ্ধ মেয়র নিজেদের অসহায়ত্বের কথাও জানান। লেবেল প্লেইং ফিল্ড নেই অভিযোগ এনে, আসন্ন সিটি নির্বাচনে নিজের প্রার্থীতা নিয়েও সংশয় জানান বুলবুল।

গত রাসিক নির্বাচনে মেয়র পদে বিপুল ভোটের ব্যাবধানে পরাজিত হন এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে তালা প্রতীক নিয়ে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন পান ৮৩ হাজার ৭২৬ ভোট। আনারস প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বাক্সে পড়ে এক লাখ ৩১ হাজার ৫৮ ভোট।

দায়িত্বভার নেয়ার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন মহানগর বিএনপির সভাপতির পদে থাকা মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। পুরো মেয়াদের মাত্র ২৭ মাস দায়িত্বপালন করেন তিনি। মাঝে পুলিশের দায়ের করা নাশকতার মামলায় কারাগারে কাটান কিছু দিন। আগামী ৫ অক্টোবর বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

ব্রেকিংনিউজ/এইচএ

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2