শিরোনাম:

মহাদেব সাহা’র ৫টি কবিতা

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
১ জুলাই ২০১৮, রবিবার
প্রকাশিত: 8:59 আপডেট: 9:03
মহাদেব সাহা’র ৫টি কবিতা

১.
তোমরা কেমন আছো


তোমরা কেমন আছো হে আমার গভীর রাতের আহত কবিতা
তোমরা কেমন আছো
কেমন আছো আমার ফেলে আসা কবিতা তুমি কেমন আছো, কেমন
আছো তোমরা সুখ দুঃখ, তোমরা তোমরা?
আমি বহুদিন তোমাদের ফেলে এসেছি, মধ্যরাতের চাঁদ তোমাদের
তোমরা কেমন আছো, সবাই কেমন আছো, তোমরা সব্বাই?
আমি বেশ কিছুকাল তোমাদের সঙ্গছাড়া, বেশ কিছুকাল
অলস নিদ্রায়, অসুখে, আচ্ছন্নতায় শুয়ে আছি, শুয়ে আছি
তোমাদের সকলের স্নান, সন্ধ্যালাপ, প্রত্যুষের উপাসনা মন্ত্র
আমার মনে পড়ে, হে পাখি, বসন্তরাত্রির একলা কোকিল
তোমাদের
শহরের সব নার্সারীর প্রত্যহ দর্শক তোমরা, পানশালার
নিমগ্ন প্রেমিক
ভবঘুরে, ছন্নছাড়া, ভাই, তোমরা কেমন আছো
নারী তুমি কেমন আছো, বৃক্ষ তুমি কেমন আছো, কেমন,
শস্য তুমি আছো, নদী তুমি আছা,
তোমাদের নিজস্ব স্বাভাবে আজো তোমরা কবি।
তবু একবার বলো, তুমি বলো, তোমরা বলো, বলো
নারী তোমরা কেমন আছো, বৃক্ষ তোমরা কেমন আছো,
তোমরা কেমন আছো, মানুষ?

২.
স্মৃতি...


সে আসে আমার কাছে ঘুরে ঘুরে যেন এক 
স্রোতস্বিনী নদীর সুবাস, ভালোবাসা সে যেন হৃদয়ে শুধু 
ঘুরে ঘুরে কথা কয়, চোখের ভিতর হতে সুগভীর চোখের 
ভিতরে, সে আসে প্রতিদিন জানালায় ভোরের রোদের মতো 
বাহুলগ্ন আমার প্রেমিকা;

সে আসে প্রত্যহ এই আলোকিত উজ্জ্বল শহরে, ইতিহাস 
আরো সব কিংবদন্তী কথা কয় আমার স্মৃতিতে, সে আসে 
দূর থেকে মনে হয় শ্যামল ছায়ায় ভরা যেন এক 
হরিণীর চোখ, অথবা রোদের সুরভিমাখা হেমন্তের শিশির সকাল 
সে আসে আমার কাছে নুয়ে পড়ে আমলকী বন; 
সে আসে আমার কাছে ভরে ওঠে বছরের শূন্য খামার 
নদীতে সহসা ওড়ে মাছরঙ নায়ের বাদাম 
ক্ষেতের দরাজ দেহ সিক্ত করে মেঘের মৈথুন, 
সে আসে আমার কাছে 
ফুটে ওঠে নিসর্গের নিবিড় কদম 
সে আসে আমার কাছে ঘুরে ঘুরে নদীর স্রোতের মতো 
জলে-ভাসা ভেলা।

৩.
এ জীবন আমার নয় . . .


এ জীবন আমার নয়, আমি বেঁচে আছি
অন্য কোনো পাখির জীবনে,
কোনো উদ্ভিদের জীবনে আমি বেঁচে আমি
লতাগুল্ম-ফুলের জীবনে;
মনে হয় চাঁদের বুকের কোনো আদিম পাথার আমি
ভস্মকণা,
ভাসমান একটু শ্যাওলা আমি;
এই যে জীবন দেখছো এ জীবন আমার নয়
আমি বেঁচে আছি বৃক্ষের জীবনে,
পাখি, ফুল, ঘাসের জীবনে।
আমি তো জন্মেই মৃত, বেঁচে আছি
অন্য এক জলের উদ্ভিদ-
আমার শরীর এইসব সামদ্রিক প্রাণীদের
সামান্য দেহের অংশ,
আমি কোটি কোটি বছরের পুরাতন একটি
বৃক্ষের পাতা
একবিন্দু প্রাণের উৎস, জীবনের
সামান্য একটি কোষ;
এ জীবন আমার নয় আমি সেইসব অন্তহীন
জীবনের একটি জীবন,
আমি বেঁচে আছি অন্য জীবনে, অন্য
স্বপ্ন-ভালোবাসায়।

৪.
একবার ভালোবেসে দেখো . . .


তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর
এই মুখে কবিতা ফুটবে না,
এই কণ্ঠ আবৃতি করবে না কোনো প্রিয় পঙ্‌ক্তিমালা
তাহলে শুকিয়ে যাবে সব আবেগের নদী।
আমি আর পারবো না লিখতে তাহলে
অনবদ্য একটি চরণ, একটিও ইমেজ হবে না রচিত,
তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো তবে
কবিতার পান্ডুলিপি জুড়ে দেখা দেবে ঘুরে ঘুরে অনাবৃষ্টি, খরা।
তুমি যদি না তাকাও এই চোখ দেখবে না কিছু
উজ্জ্বল আলোর ভোর ঘন অন্ধকারে ঢেকে যাবে,
সন্ধ্যাতারা মনে হবে মৃত নিষ্পলক চোখ
যদি ফিরে না তাকাও মর্মে আর পল্লবিত হবে না কবিতা।
তুমি যদি না দাও চুম্বন এই মুখে ফুটবে না ভাষা
মরা গাঙে জাগবে না ঢেউ, দুই তীরে প্রাণের স্পন্দন,
হবে না শস্যের মাঠে শ্রাবণের ব্যাপক বর্ষণ
হৃদয়ে হৃদয়ে আর অঙ্কুরিত হবে না কবিতা, বাজবে না গান।
তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর
প্রকৃতই আমি আগের মতন পারবো না লিখতে কবিতা
আমার আঙুলে আর খেলবে না জাদুর ঝিলিক,
এই শাদা পৃষ্ঠা জুড়ে ফুটবে না জুঁই আর চাঁপা।
একবার ভালোবেসে দেখো, একবার কাছে ডেকে দেখো
আবার আগের মতো কীভাবে ফুটাই এক লক্ষ একটি গোলাপ
অনায়াসে কীভাবে আবার অনুভূতি করি সঞ্চারিত,
একবার ভালোসেবে দেখো আবার কীভাবে লিখি দুহাতে কবিতা।

৫.
তোমাকে ছাড়া. . .


তুমি যখন আমার কাছে ছিলে 
তখন গাছের কাছে গেলে আমার ভীষণ আনন্দ বোধ হতো 
লতাপাতার উৎসাহ দেখে আমি সারাদিন তার কাছে ঘুরে বেড়াতাম 
কোন কোন দিন পাখিদের 
বাসভূমিতে আমার অনেক উপাখ্যান শোনা হতো 
তুমি যখন আমার কাছে ছিলে 
তখন প্রত্যহ সূর্যোদয় দেখতে যেতাম তোমাদের বাড়ির পুরনো ছাদে 
তোমার সেই যে দজ্জাল ভাই সারারাত তাস খেলে এসে 
পড়ে পড়ে তখনো ঘুমাতো, 
তুমি যখন আমার কাছে ছিলে 
তখন আমার রোজ ভোরবেলা ঘুম ভাঙতো, যেতাম প্রকৃতির কাছে মানবিক অনুভূতি নিয়ে 
মানুষের দুঃখ দেখে আমার তখন ভীষণ কান্না পেতো 
এখন আমার আর সেই অনুভব ক্ষমতা নেই 
মানুষের নিষ্ঠুরতা ও পাপ দেখেও আমি দিব্যি চায়ের দোকানে বসে হাসতে হাসতে চা খাই 
সেলুনে চুল কাটার সময় পাশেই অবৈধ কতো কী ঘটে যায় 
তুমি কাছে না থাকলে আমি দিন দিন অমানুষ হয়ে উঠি 
আশেপাশে সবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করি 
মানুষ ও প্রকৃতির দিকে চেয়ে আমার হিংসা বোধ হয় 
তুমি না থাকলে মেয়েদের রূপ কিংবা ফাহমিদা খাতুনের 
রবীন্দ্রসঙ্গীত কিছুই আমাকে আকর্ষণ করে না 
শিশুদের প্রতি মমত্ববোধ জাগে না আমার 
একে একে সকাল দুপুর সারাদিন নষ্ট হয় 
কোনোকিছুই করতে পারিনে আমি 
তুমি না থাকলে বড়ো দুঃসময় যায়, সর্বত্র বন্ধুবিহীনভাবে বাস করি 
এই ঢাকা শহর ভীষণ রুক্ষ মনে হয় 
কাউকে ডাকলে সাড়া দেয় না,
সবাই আমার বিরুদ্ধাচরণ করে 
তুমি না থাকলে এই বাড়িঘর শহরের লোকজন 
সম্পূর্ণ আমার অপরিচিত মনে হয় 
নিজেকেই নিজের অচেনা লাগে 
মনে হয় দীর্ঘ দিন থেকে আমি যেন কোনো অজ্ঞাত অসুখে ভুগছি 
তুমি না থাকলে বাস্তবিক আমি বড়ো কষ্টে পড়ি 
বড়োই কষ্ট হয়।

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2