শিরোনাম:

বঙ্গবন্ধু হত্যা ও বর্তমান বাংলাদেশ

মিথুন রায়
১৫ আগস্ট ২০১৮, বুধবার
প্রকাশিত: 3:42 আপডেট: 3:46
বঙ্গবন্ধু হত্যা ও বর্তমান বাংলাদেশ

“এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন, শিয়রে যাহার ওঠেনা কান্না, ঝরেনা অশ্রু?/ হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং/ এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন, বিরহে যেখানে নেই হাহাকার? /কেবল সেতার হয় প্রপাতের মোহনীয় ধারা, অনেক কথার পদাতিক ঋতু কলমেরে দেয় কবিতার কাল?” (স্মৃতিস্তম্ভ: আলাউদ্দিন আল আজাদ)

’৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন কালপ্রবাহে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যতটা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে ঠিক ততখানিই তাঁকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সেই বিতর্কগুলো যে নিরেট সত্যানুসন্ধানের তাগিদে তা কিন্তু মোটেই বলা যাবে না। বরং বলতে হবে, গত চার দশকে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে যত ইতি-নেতি বাক্যব্যয় তার কিঞ্চিৎ বাদে প্রায় সবটুকুই ক্ষমতা দখল কেন্দ্রিক। মসনদে আরোহনের উদ্ভট মহড়ায় বারবারই ইতিহাস ব্যাখ্যাকারী ও বিকৃতিকারী তথা রাজনীতিকদের উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত কৌশলের বলি হতে হয়েছে জাতির এই মহানায়ককে। মোটের উপর দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো বঙ্গবন্ধুকে কিংবা সামরিক শক্তি নিয়ে ক্ষমতা দখলকারী অন্যকোনও দলের প্রতিষ্ঠাতাকে হাতিয়ার করে বারবারই ক্ষমতা দখলের দিকে ধাবিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে নেতার আদর্শ নয়, নেতাকে বিকিয়ে দিতেও আমাদের রাজনীতিকরা কার্পণ্য করেন না কখনও কখনও। এমনকি আদর্শের নেতাকে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় প্রতিনিয়তই চালিয়ে যাচ্ছে ‘পলিটিক্যাল অ্যান্ড আইডিওলজিক্যাল ব্লেম গেইম’। 

আজ বঙ্গবন্ধু হত্যার চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত। এই সময়কালে অর্থাৎ গত প্রায় ৪৩ বছরের পথচলায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। কিন্তু সব গ্রন্থেই কি সঠিক ইতিহাস ব্যাখ্যা হয়েছে? এই ৪২ বছরে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে আমরা (একটি বিশেষ অংশ) কি বারবারই ইতিহাসকে খণ্ডিত করিনি। যতটা না অজ্ঞানে তারচেও বেশি কি জ্ঞাতসারে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস বিকৃতি হয়নি? সেটা যে হয়েছে তা বোঝার জন্য বিশেষ কোনও বুদ্ধিজীবীর আশ্রয় নেয়ার বোধকরি প্রয়োজন হবে না। সামান্য সচেতন মানুষ একটু পরিষ্কার চোখে তাকালেই তা আঁচ করতে পারবেন। কথাটা হচ্ছে- আওয়ামী লীগ যাঁকে আদর্শ করে প্রতিদিন রাজনীতির বুলি আওড়ে যাচ্ছে সেই দলটি কি তাদের মানসপিতার ইতিহাসকে সঠিক, অখ- ও নির্মোহভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছে। তারা কি পেরেছে সত্যিকারের বঙ্গবন্ধুকে জাতির সামনে তুলে ধরতে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি নিখাদ দলিল প্রস্তুত করতে। স্বাধীনতা পরবর্তী বিশেষত এরশাদ সরকারের পতনের পর বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ধ্বজাধারী একাধিকবার ক্ষমতায় আসা এমনকি বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা দলটির কি প্রকৃতি ইতিহাসের পথে পা চালানোর কোনও দায় ছিল না? দায় মোচনে এই ব্যর্থতা কি ভবিষ্যতে এই দলটিকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে না? সেটি হয়তো সময় বলবে, আপাতত আমাদের আলোচ্য বিষয় “বঙ্গবন্ধু হত্যা, বাঙালির কলঙ্কিত ইতিহাস ও বর্তমান বাংলাদেশ”।

পাকিস্তানি শোষণ-নিপীড়ন-নিষ্পেষণ থেকে একটি পরাধীন জাতিকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে, ভাষা ও অধিকারের প্রশ্নে স্বরাজ প্রতিষ্ঠায় যে মানুষটি আপসহীনভাবে লড়েছেন জাতির চোখে তিনি শুধু একজন আপাদমস্তক রক্ত-মাংসের মানুষই নন, তারচেও বেশি কিছু। বলা যায়, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও লাল-সবুজের একটি পতাকার পরতে পরতে লুকায়িত এক চেতনার, জাগরণের, আবেগের নাম বঙ্গবন্ধু। কিন্তু এত বছরেও কি আমরা তাঁর চেতনাকে আমাদের মননে, মগজে, কর্মে ধারণ করতে পেরেছি? পারিনি বলেই রাজনীতি তথা রাষ্ট্র পরিচালনায় আজ এত বিপর্যয়। এত ভারসাম্যহীনতা। 

আমাদের রাজনীতিকরা প্রতিদিন বঙ্গবন্ধুকে অতিমানব রূপে দেশবাসীর সামনে বিশ্বমঞ্চে হাজির করতে চান। যেন তারা বলতে চান- তিনি অন্য গ্রহের কেউ ছিলেন। তাদের ভাবখানা এমন যে, বঙ্গবন্ধুকে শুধু ফুল-জল দিয়ে পুজো করা চলে, তার ব্যত্যয় কিংবা অন্যকিছু হলে পাপের মাত্রা হবে ‘ঘোরতর’। যেতে হতে পারে রৌরব নরকেও। কিন্তু কেন এই মিছে আয়োজন। কার স্বার্থে, কীসের লোভে? এরকম ছোটখাটো প্রশ্নের যথার্থ উত্তর প্রবন্ধের প্রারম্ভে উল্লিখিত। তবে প্রশ্ন হতে পারে- যারা তাঁকে অতিমানব রূপে উপস্থাপন করতে মরিয়া তারা কি আদৌ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তাদের রাজনৈতিক চেতনায় অখ-ভাবে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন? হননি বলেই কি তারা বঙ্গবন্ধুর বিশালত্বকে সংকীণর্, সঙ্কুচিত এবং খ-িত করছেন না!

অপ্রিয় হলেও বাস্তবতা হচ্ছে- বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের সঙ্গে আজকের আওয়ামী লীগের একটা রাজনৈতিক ও আদর্শিক ব্যবধান ইতোমধ্যে পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। আমাদের মাননীয় সরকারপ্রধান প্রায়শই বলে থাকেন- তাঁর সরকার জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সোনার বাংলা গড়তে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি যথার্থই বলেন। সোনার বাংলাই তো গড়তে চেয়েছিলেন শেখ মুজিব। সোনার দেশে সোনার মানুষের মুখে সূর্যমুখী ফুলের হাসিই তো দেখতে চেয়েছিলেন শেখ মুজিব। কিন্তু আমরা কি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই সোনার বাংলার সন্ধান পেয়েছি। পেয়েছি কি একটি সোনার মানুষের দেশ। সেটা পেতে যা কিছু করণীয় নির্লোভ নির্মোহ চিত্তে সেই পথ অবলম্বন করেছি কি আমরা। সত্যি কথাটা হচ্ছে, সোনার বাংলা গড়ার পথে যে পদক্ষেপ যে পথচলা আমরা সেই পথকে চিহ্নিত করতে পারলেও চলার পথে বারবারই দিকভ্রান্ত হচ্ছি! যাঁকে পাঞ্জেরি করে আমাদের গন্তব্যের পথে যাত্রা সেই তাঁর হাতের আলোকবর্তিকাটিতে ফুঁ দিয়ে আমরা কি মাঝ দরিয়ায় হাবুডুবু খাচ্ছি না। যদি তাই হয় তবে অন্ধকারে তরী তীরের দেখা কবে পাবে সেটির চেয়েও বড় ভয়ের কারণ হতে পারে- না জানি কখন ডুবে সোনায় মোড়ানো স্বপ্নের সেই তরীখানি।

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে যে বিষয়টির প্রতি আলোকপাত করা প্রয়োজন তা হলো ’৭২ এর সংবিধানের চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি আমাদের সংবিধানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবেই গৃহীত হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল যে এই চার মূলনীতি রাষ্ট্রের মতাদর্শিক স্তম্ভ এবং সেই সঙ্গে গৌরবোজ্জ্বল অর্জনের স্মারক। আশা করা গিয়েছিল যে এই চার মূলনীতি কখনোই পরিত্যক্ত হবে না। তাদের নির্দেশনাতেই আমরা সামনে এগোব। গড়বো শেখ মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলা। কিন্তু গত সাড়ে চার দশকের লাগামহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার পালাবদল ও ধর্মতন্ত্রী প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী গোষ্ঠীর আঘাতে আঘাতে আজ সেই মূলনীতি থেকে ক্রমে সরে যাচ্ছে রাষ্ট্র। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির যে চারটি মূলনীতি ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে উৎপাটন করেছে ১৯৭৫-১৯৯০ পর্বে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনতাইকারী সামরিক জান্তা। পাকিস্তানি ধারায় সেনা ছাউনির রাজনীতি উৎপাটিত করার চেষ্টা করেছে বাঙালি জাতীয়তাবোধকে, জন্ম দেয়া হয়েছে মানচিত্র-ভিত্তিক, বিভেদকামী তথাকথিত ধর্মীয় জাতীয়তাবোধের কৃত্রিম ধারণা। সকল ধর্মের সম-মর্যাদা প্রদানকারী ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার প্রদানকারী সমাজতন্ত্রকে ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ শব্দগুচ্ছের আড়ালে নির্বাসনে পাঠিয়ে পরনির্ভরশীল মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদের দর্শন ‘মুক্তবাজার অর্থনীতিকে’ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে লালন করা হচ্ছে গত ৪৫ বছর ধরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা এবং বাঙালিত্ব। তাই রাষ্ট্রচরিত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে জনগণের মালিকানাধীন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা, যে রাষ্ট্র শোষিত-বঞ্চিত শ্রমজীবী জনগণের শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সুকঠিন সংগ্রামে শ্রমজীবী জনগণের পক্ষের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে, যে রাষ্ট্র সমাজ পরিবর্তনকে তার মূল ব্রত হিসেবে বিবেচনা করবে। কিন্তু সামরিক স্বৈরশাসকগণের চক্রান্তে তা হয়নি। 

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের কয়েকটি ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে সামরিক জান্তাদের অবৈধ ও অ-সাংবিধানিক কাটা-ছেঁড়ার পর্ব পেরিয়ে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে বিধৃত রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু, ২০১১ সালে সংবিধানের যে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হলো, তাতে রাজনীতির সাম্প্রতিক বাস্তবতা তুলে ধরা হলেও সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’-এ দুটো নীতিকেই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে প্রতিক্রিয়াশীলদের পথও হয়েছে কণ্টকমুক্ত। এই ফাঁকে ধর্মীয় উগ্রবাদ, সন্ত্রাস এবং স্বরচিত তথাকথিত ইসলাম নিয়ে চলছে ক্ষমতা লাভের উলঙ্গ তাণ্ডব। বঙ্গবন্ধু কি এই জন্য গণতন্ত্রের পথ ধরে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন? আজ যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জারি গেয়ে তাঁর আদর্শকে ঘরে-বাইরে বিকিয়ে দিচ্ছেন, বিকৃত কিংবা অপব্যবহার করছেন তারা কি সোনার বাংলা গড়ার পথকে ইনটেনশনালি পরোক্ষভাবে হলেও কণ্টকার্কীণ করছেন না! 

বঙ্গবন্ধু হত্যার কথাই যদি বলি- এত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও ঘাতকরা চিহ্নিত হওয়ার পরও বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে কেন? বাংলাদেশে যদি সুষ্ঠু ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা হতো তবে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই এই নারকীয় হত্যার বিচার বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতেন। না আসলেও অন্তত দূরে দাঁড়িয়ে ব্যাঙ্গোক্তি করার মতো স্পর্ধা দেখাতেন না। কিন্তু বাস্তব চিত্র তো তেমনটিই। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ কি আজও পেরেছে ঘরের শত্রু বিভীষণকে একঘরে করতে। উল্টো, কিছু ক্ষেত্রে ওইসব বিভীষণদের সঙ্গে গলাগলির চিত্রও দেখেছে দেশবাসী। এসবই কি ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার সূক্ষ্ম, সুপরিকল্পিত ও ভয়ানক কৌশল নয়!

১৫ আগস্টের পর এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজে যে ধারাবাহিক চিত্র উঠে এসেছে আমরা যদি সেদিকে একবার চোখ রাখি তবে দেখবো- “পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু এ হত্যাকাণ্ডের বিচারে পদে পদে বাধা আসে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার। ওই বছরের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন।

১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন। নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদ- নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় দেন। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেন। এরপর ১২ আসামির মধ্যে প্রথমে চারজন ও পরে এক আসামি আপিল করেন। কিন্তু এরপর ছয় বছর আপিল শুনানি না হওয়ায় আটকে যায় বিচার-প্রক্রিয়া।

দীর্ঘ ছয় বছর পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আপিল বিভাগে একজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটি আবার গতি পায়। ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির লিভ টু আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। আপিলের অনুমতির প্রায় দুই বছর পর ২০০৯ সালের অক্টোবরে শুনানি শুরু হয়। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া পাঁচ আসামির আপিল খারিজ করেন। ফলে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে হাইকোর্টের দেওয়া ১২ খুনির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকে। এর মধ্য দিয়ে ১৩ বছর ধরে চলা এ মামলার বিচার-প্রক্রিয়া শেষ হলে দায়মুক্ত হয় বাংলাদেশ। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ ও মুহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসি কার্যকর হয়। ওই রায় কার্যকরের আগেই ২০০২ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা যান আসামি আজিজ পাশা। পলাতক বাকি ছয়জন হলেন খন্দকার আবদুর রশীদ, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও মোসলেম উদ্দিন। আসামিরা সবাই সাবেক সেনা কর্মকর্তা।” (বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরাতে অগ্রগতি, দৈনিক প্রথম আলো, ০৯ আগস্ট ২০১৭ সংখ্যা) 

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তরুণ বিপ্লবী ভগৎ সিং-এর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে লেখার লাগাম টানতে চাই। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের চরম পর্যায়ে ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে রাজগুরু ও সুখদেবসহ ভগৎ সিং এর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাঁর মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত সমর্থকরা তাঁকে ‘শহীদ’ উপাধিতে ভূষিত করে। ভগৎ সিংকে সুতলেজ নদী তীরে হুসেইনিওয়ালায় সমাধিস্থ করা হয়। বর্তমানে ভগৎ সিং এর স্মৃতিসৌধটি ভারতের মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি নিবেদিত। এই বিপ্লবী ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ানোর আগে বলেছিলেন- "ব্যক্তিকে সহজেই হত্যা করা যায়, কিন্তু আদর্শকে হত্যা করা যায় না। বড় বড় সাম্রাজ্য ভেঙে গুড়িয়ে গেছে কিন্তু আদর্শ টিকে থেকেছে।"

সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তরে উদ্দেশ্যমূলকভাবে যে ধরনের ধর্মীয় বিভেদমূলক উস্কানি ও মাদকতা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তাতে করে এখনই যদি মেরুদ- সোজা ও শক্ত করে দাঁড়ানো না যায়, যদি প্রতিরোধ গড়তে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়, যদি ক্ষমতার লোভে রাষ্ট্র আপসকামী হয় তবে তার বিষফল অদূর ভবিষ্যতে পুরো জাতিকেই হজম করতে হবে। সেদিন হয়তো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের তথাকথিত রাজনীতিকদেরই দায়টা অধিক অংশে নিতে হবে! তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে সফল করতে, এদেশকে সোনার বাংলা রূপে গড়ে তুলতে আবারও মুষ্টিবদ্ধ হাতে ঘুরে দাঁড়াতে হবে সকল ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে। এবং সেটি করতে হবে অবিলম্বে, অতিদ্রুত। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে ভগৎ সিং-এর সেই রক্তে আগুনজ্বলা বিখ্যাত উক্তিটি। একই সঙ্গে কর্মে ও মননে এ বিশ্বাস ও শক্তি ধারণ করতে হবে যে, “বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলেও তাঁর আদর্শ অটুট আছে কোটি বাঙালির রক্তের শিরায় শিরায়”। আর সেই আদর্শই তো বাঙালির জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের চিরকালের অক্ষয় শক্তি। 

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2