শিরোনাম:

সিকতা কাজল-এর কবিতা

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, শনিবার
প্রকাশিত: 9:31
সিকতা কাজল-এর কবিতা

১.
তখন শিমুল শাড়ি পরা শেখেনি । শাড়ি পরার ইচ্ছেও হয়নি সে সময় । বাবা অসুস্থ। ডেকে বললেন - শিমুল মা; শাড়ি পরোত। শাড়ি পরলে তোমায় কেমন দেখাবে তা দেখার বড় ইচ্ছে আমার। শিমুল বড়পুকে গিয়ে বললো। বড়পু একটি কালো রঙের শাড়ি শিমুলকে পরিয়ে দিলেন। মায়ের আলমারী থেকে বের করে। কালো শাড়িটি পরে যখন বাবার সামনে দাঁড়াল শিমুল তখন বাবা চুপ চাপ দেখছে -দেখছে। কিছুই বলছেনা... শিমুলের খুব জানতে ইচ্ছে করছিলো শাড়ি পরে ওকে কেমন লাগছে??? একটু পর বাবা মাকে ডাকছে -- 'হালিমা হালিমা দেখে যাও। আমাদের শিমুল শাড়ি পরে কত বড় হয়েছে। আমার মেয়ের মত সুন্দর মানুষ পৃথিবীতে আর দুটো নেই'.... বাবা হু হু করে কাঁদছেন। বাবার কান্না দেখে শিমুল অবাক! শিমুলের শাড়ি পরা দেখে বাবার কাঁদার কি হলো???? দৌঁড়ে গিয়ে শাড়িটি খুলে জামা পরলো শিমুল । দেড়মাস পর বাবা মারা গেলেন। তখন বুঝলো শিমুল বাবার কান্নার ইতিহাস। চিনলো বাবার চোখের জলের রঙ। এখনও শাড়ি পরে শিমুল মাঝে - মাঝে। নিজেকে দেখেও নেড়েচেড়ে। বাবার মত কেউ এত বিস্মিত হয়না শাড়ি পরা শিমুলকে দেখে... কেউ বলেনা - পৃথিবীর সেরা সুন্দর শিমুল .. বাবার দৃষ্টি পৃথিবীর সব চেয়ে সুন্দরতম দৃষ্টি। মা বলেন - পরে নাকী বাবা মাকে বলেছিলেন -' মেয়েকে কনের সাজে ; বউয়ের সাজে দেখতে পারলাম না। ওর বিয়েটা কিন্তু খুব ভাল ছেলের সাথে দিও.. আর খুব ধুমধাম করে দিও...' শিমুলের চোখে আষাঢ়ের ঢল নামে। বাবার মুখটি ভেসে ওঠে। এখন শিমুল রাজপথে ; শহরের আনাচে কানাচে ঘোরে... দিনশেষে রাতের নির্ধারিত ক্ষণে মনে হয় বাবার মত কেউ নেই --- কেউ হয় না.... হতে পারেনা....(নিঃসঙ্গ শিমুলের দহনের অশ্রু)

২.
দু জোড়া পা দু দিকে যায় - অথচ তাদের একসাথে চলার কথা ছিলো। এ ব্যবধান পনের বছরের। শহরের নির্জনতায় আমি। তুমি কোলাহলে। তোমার কথাগুলো আমাদের শহরের নতুন ক্যানভাস। ক্যানভাসে দেখি সাদা বকের খেলা। তুমি অনেক জোড়া পা নিয়ে শহরের বালিকা সময়ে হেঁটে বেড়াও... আমি হলুদ বিকেলকে সাথে করে রাতের উঠোনে বসে থাকি। ঠাকুমার ঝুলি থেকে যেমন নানা রসের গল্প বের হয়। তেমনি আমাদের উঠোনের চারপাশে জীবন জোনাকী। উৎসব চলতে থাকে। হাজার- হাজার চেতনায় তোমার কণ্ঠস্বর জেগে ওঠে। আমি এক জোড়া পায়ের দিকে তাকাই। সে পায়ে রুপালী নুপূর। তোমার আর আমার সুরে নুপূরটি বাজতে থাকে। ওপারে তুমি এ পারে আমি। মাঝখানে আমজনতার কোলাহল। আমি কোলাহলকে ছাপিয়ে কেবল তোমার বলিষ্ঠ মায়াময় কণ্ঠস্বর শুনি..
চৈতালী সময়; কেবল ছায়া প্রেম রচনা করে। আমি তোমার ছায়ার সাথে চলি। ছায়া যখন লম্বা হয়; তখন আমি ছোট হতে থাকি। ছায়া ছোট হলে আমি হই অনন্ত। তোমার সীমাহীন পথে পড়ে থাকি। সকাল বিকেল কিংবা রাতের যেকোন প্রহরে। অন্ধকারে আমি অনেকগুলো মুখ দেখি... সেগুলো কেবল মুখ। কিন্তু একটি মুখের উপর চোখ পড়লে নদী - নালা ; খাল- বিল ; সমুদ্র - পাহাড় - পর্বত সব একাকার হয়। আমি কাপঁতে থাকি ভিতরে বাহিরে।। অথচ - তোমাকে চাইলেই ছুঁতে পারিনা.......(মেঘসময়)

৩.
কখনও কখনও অকারণে মন খারাপ হয়। মনের অতল তলে গিয়েও মনের সন্ধান মেলেনা। রাত বাড়ছে। বাড়ছে ঘুম ঘুম মুখ আর নিঃশ্বাস। ভারী নি:শ্বাসগুলো আরও ভারী হচ্ছে। ঘুমদেবীরা ঘুমহীন মানুষগুলোর মনে আনছে নানা ধরণের ভাবনা। ভাবনাগুলো ফ্যানের পাখার মত ভন ভন করে ঘুরছে। রেডিয়ামের আলোয় রুমটি চুম্বকীয় সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। অসহ্য সুন্দরে ভেসে যাচ্ছিলাম। পাঁচতলার রুমটার দক্ষিণে জানালাটা খুলে দিলে হু হু করে বাতাস ঢোকে। শীত-শীত লাগে শেষ রাতে। নকশীকাঁথা গায়ে জড়িয়ে একটি নরম প্রজাপতি দেখি। প্রজাপতিটি সারা রুমে ঘুরে বেড়ায়। প্রজাপতিকে ধরার ইচ্ছে হয়। কিন্তু পৃথিবীর সব ক্লান্তি জেকে বসেছে শরীরে। কোথাও নেই এতটুকু ইচ্ছে নূপুর। যে শক্তি নিয়ে ঘরময় দৌঁড়াবো। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। আঙুলের ভিতর অক্ষর ক লিখতে গিয়ে হয়ে উঠছে খ। সারস লিখতে গিয়ে; লিখে ফেলছি টুনটুনি। কাঁথার ভিতর দুটো পা ; হাত ; মুখ ; নাক কাছাকাছি আসছে.... চিংড়ি মাছের মত কুকড়ে যাচ্ছে শরীরের ভাজ। আমি চোখ বুজি। তোমার মুখটি ভেসে উঠে রাতের কার্ণিশে। স্নানঘরে ; ব্যালকনিতে ; ফুলের টবে ; বুকসেল্পে ; লেখায় ; বইয়ের পাতায় একটা মুখ দেখি। সে মুখে শত সহস্র মানচিত্র। আমি পতাকা আর মানচিত্র বুকে নিয়ে ঘুম ঘুম চোখ বুজে ফেলি... হঠাৎ সমুখে এসে দাঁড়াও তুমি। তুমি চেতনার বালিশে মাথা রেখে ঘুমাও। আমি ঘুম ঘুম চোখে জেগে কাটাই সারারাত.... (মেঘসময়)

৪.
বুকের ভিতর ফুটে আছে অজস্রফুল। সুগন্ধি ফুলের ভিতর বসে আছে একজন নান্দনিক প্রেমিক। প্রেমিকের চোখের কর্ণিয়ায় দেখি তুলো মেঘ। মেঘগুলো ভাসছে। সমুদ্র সফেদ মন কেবলি উড়ছে। খড়ের পালার ভিতর পাখির পালক। ধানের জমিতে পড়ে থাকা সারস পাখিটি গতকাল থেকে কাতরাচ্ছে। প্রেমিক সারস হৃদয়ে ঢুকে অনবরত হাতুড়ি পেটাচ্ছে। কচি কচি সবুজ পাতা নৈবেদ্য নিয়ে বসে আছে। প্রেমিক না আসে শত শত শিশু। শিশুদের ছোট ছোট হাত- পায়ের নৃত্যে আমুদিত হয় তুলো- প্রেমিক। শিশুরা হলুদ ফুলে নানা রঙের প্রজাপতি দেখে। পায়ের কাছে পড়ে থাকে বকুল ফুল। আমরা শিশুদের চোখে আগামী দেখি। প্রেমিক রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। রজনীগন্ধাগুলো অগনিত শিশুর হাসি হয়ে ঝরে পড়ে। আমি প্রেমিক না; কোটি কোটি শিশুমুখ দেখি। বাতাসের বোতাম খুলে ঢুকে পড়ি পৃথিবীতে। দেখি সারি সারি শিশু দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই প্রেমিক --- প্রেমিকের সারা শরীরে তুলো তুলো মেঘ --- মেঘের গায়ে লেখা -- ভালবাসি - ভালবাসি - ভালবাসি.....। (মেঘসময়)

৫.
একজন প্রেমিক কেবল প্রেমিক নয়। তার ভিতর বেড়ে ওঠা গাছগুলো মমতার ; স্নেহের আঁধার। প্রেমিকের মিষ্টি ঠোঁটে শিশির জমে। শিশিরের কোমলতায় ফুটে ওঠে সূর্য। সূর্যমুখী ভালবাসা তখন উর্ধবমুখী। প্রেমিকের হাতের মুঠোয় শক্ত করে জড়িয়ে থাকা দুহাত তখন একটি হলুদ জমিন। আমি আমরা প্রেমিকের হাতের মুঠোয় চা পাতার নির্যাসে ; ক'ফোঁটা গরম জলে ছেড়ে দেই লাবন্য সময়। কতকাল ; কত সময় এভাবেই গড়িয়ে যায়... প্রেমিকের চুম্বনের বুদবুদ থেমে যায়। ঘামঝরা শরীরে লোনা জলের ভিতর ভেসে ওঠে চোখের নদী। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। আমরা সে জলের নদীতে সাঁতার কাটি। সাঁতার কাটতে - কাটতে পাড়ি দেই অযুত পথ। কবে এক বর্ষালী মাসে। ক্ষেতে পারি ধান ; আউশ ধান ; বিন্নী ধানের শীষে বধূর নোলক পড়া হাসির ঝিলিক দেখেছি। মৌ মৌ গন্ধে ধানের ধারাপাতে কিছু মেঘ। দলা দলা মেঘগুলো ভেসে যায় আকাশের পথে। যে পথের শেষ সীমানায় মহাশূণ্যতা । দলাদলা মেঘগুলো ভেসে যায় উপরে - অনেক উপরে... ষোল হাজার বর্গফুট উপরে উঠে মেঘগুলো থেমে যায়। দেখে এক বিমান। বিমানে বসে থাকা প্রেমিকের চোখে একটি নাম -- সে নাম জপ করছে । মেঘ বললো - "ওহে প্রেমিক লিখে দাওনা তোমার প্রেমিকার নাম। আমরা পৌঁছে দেব পৃথিবীর কাছে। সেখানে প্রেমিকার নামটি জল হয়ে ঝরে পড়বে। মাটিতে মিশে হবে গাছের সঙ্গী ; রোদের বন্ধু আর হবে মানুষের ভালবাসা। " এভাবে সাগর ; সৈকত ; পাহাড় ; সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রেমিক - প্রেমিকা হয়ে যাবে কাল - মহাকাল... সাদা সাদা মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছে দূর অজানায়। প্রেমিকের বিমানটি নিচে নামে । কথা যন্ত্রে তখন প্রণয় ঝড়। তুমুল প্রণয় সুনামী শেষে প্রেমিক ঘুমিয়ে যায় -- ঘুমে জাগরণে প্রণয় কথন চলতেই থাকে। প্রেমিক প্রেমিকার নিঃশ্বাস হয়ে মখমল শোভিত বিছানায় শুয়ে থাকে নির্জনে। (মেঘসময়)
ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2