শিরোনাম:

বরফের দেশে তুষারঝড়ের গান

পরিবেশ-পর্যটন ডেস্ক
৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: 7:32 আপডেট: 7:32
বরফের দেশে তুষারঝড়ের গান

আইসল্যান্ড নামটি উচ্চরণের সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে বরফে ঢাকা অন্য এক পৃথবীর ছবি ভেসে উঠে। বছরজুড়েই যে দেশটিতে তুষারপাত হয়, আর বাতাসে কান পাতলেও শোনা যায় সেই তুষারঝড়ের গান। কিন্তু আসলেই কি বরফে ঢাকা আইসল্যান্ড? না, ঠিক ততটা নয়। বরং বিশ্বের অন্যতম প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর এই দেশ ভ্রমণপিপাসু যেকোনও মানুষেরই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ঈশ্বর যেন নিজ হাতে গড়েছেন বরফের এই ভূখণ্ডটিকে।

তারচেয়েও মজার ব্যাপার হচ্ছে- আইসল্যান্ডে মানুষের চেয়েও ভেড়ার সংখ্যা বেশি। দেশটিতে নেই কোনও রেলপথ। দেশটির জনপ্রিয় খাবার হলো ‘হট ডগ’। আর জাতীয় খাবার হচ্ছে ‘Hákarl’। যার অর্থ হলো পচে যাওয়া হাঙর। আইসল্যান্ড পৃথিবীর ১৮তম ও ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র। 

৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে আইসল্যান্ডের সংসদ গঠিত হয়। যেটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম সংসদগুলোর একটি বলা হয়ে থাকে। প্রায় ১০০০ বছর পূর্বে দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আইসল্যান্ডের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একজন মহিলা। তিনি সমকামী ছিলেন তবে তিনি তা গোপন করেননি।

উত্তর আটলান্টিক এবং আর্কটিক মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় এখানে শীতকালীন রাত ও গ্রীষ্মকালীন দিন দীর্ঘতর হয়। আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিক শহরে একটি জাদুঘর আছে। যেটিকে ‘লিঙ্গ’ জাদুঘর বলা হয়। এখানে বিভিন্ন প্রাণীর লিঙ্গ সংরক্ষণ করা হয়। 

আইসল্যান্ডবাসীর সবচেয়ে প্রিয় খাবার আইসক্রিম। তাপমাত্রা যাই থাকুক, এমনকি শীতের সময়ই তারা আইসক্রিম খেতেই বেশি পছন্দ করে। আইসল্যান্ডীয়রা কোকা-কোলা প্রেমিকও বটে। দেশেটির জাতীয় ক্রীড়া হলো হ্যান্ডবল। তবে সেখানে সাপ, টিকটিকি বা কচ্ছপ পোষা তাদের আইন বিরুদ্ধে।

বরফে ঢাকা এই দেশটিতে কোনো সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমান বাহিনী নেই। আইসল্যান্ডের পুলিশ তাদের সাথে অস্ত্র হিসেবে বন্দুক বহন করে না। এর কারণ সেখানে অপরাধ খুব কম হয় এবং বড় ধরনের কোনো অপরাধ প্রায় নেই বললেই চলে। এজন্য পৃথিবীর অন্যতম শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রও বলা হয় আইসল্যান্ডকে। 

এছাড়াও আইসল্যান্ড এমন একটি পরিষ্কার দেশ, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হয় না। কেবল মশা নয়,  মানুষের সমস্যা সৃষ্টিকারী এমন পোকা-মাকড় এর সংখ্যা অনেক কম। 

আইসল্যান্ডের মানুষ চিন্তা-চেতনায় অনেক প্রগতিশীল। দেশটির প্রায় ৯৭.৬% মানুষ ইন্টারনেট ব্যাবহার করে। আইসল্যান্ডীয়দের বলা হয় ‘বইপোকা’। এক জরিপে বলা হয়েছে, আইসল্যান্ডের ১০% মানুষ তাদের জীবনকালে একটি হলেও বই প্রকাশ করে। দেশটিতে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বই এবং পত্রিকা প্রকাশনী রয়েছে।

প্রায় ১০০০ বছর আগে খ্রিস্টীয় ৯ম শতকে ভাইকিং অভিযানকারীরা আইসল্যান্ডে বসতি স্থাপন করে। আইসল্যান্ডবাসী তাদের ভাইকিং ঐতিহ্য নিয়ে বেশ গর্ব করে। বহু গ্রামীণ আইসল্যান্ডীয় অধিবাসী প্রাচীন নরওয়েজীয় পূরাণের নানা দৈত্য-দানব যেমন পরী, ট্রোল, ইত্যাদির অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। ব্যাপারটা হাস্যকর হলেও সত্য।

তবে জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বহু দেশের থেকেই পিছিয়ে আইসল্যান্ড। দেশটিতে মোট জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে ৩ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক মানুষ আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিক বা এর আশেপাশের এলাকায় বসবাস করে। আইসল্যান্ডের আয়তন প্রায় ৩৯ হাজার বর্গ মাইল। যা প্রায় বাংলাদেশের আয়তনের এক-তৃতীয়াংশ সমান।

আইসল্যান্ডের পানি এতটাই পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ যে তা ফুটিয়ে কিংবা ফিল্টার করে পান করতে হয় না। মজার ব্যাপার হচ্ছে- শীতকালেও তাদের পানি গরম করতে হয় না। কারণ, দেশটিতে প্রাকৃতিকভাবেই গরম ও ঠান্ডা উভয় ধরনের পানি পাওয়া যায়।

বরফের দেশ বলায় আমরা অনেকেই মনে করতে পারি আইসল্যান্ড বোধহয় খুব ঠান্ডাপ্রবণ দেশ। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। ভৌগলিকভাবে একেবারে উত্তর সুমেরুর কাছে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণ উপসাগরীয় সমুদ্রস্রোতের কারণে এখানকার জলবায়ু তুলনামূলকভাবে মৃদু। ঠিক গরমও নয়, আবারও প্রচণ্ড ঠান্ডাও নয়। এক কথায় দারুণ এক রোমান্টিক আবহাওয়া সারা বছর বিরাজ করে দেশটিতে। 

তবে আইসল্যাণ্ডে গাছগাছালি-বনাঞ্চলের পরিমাণ খুবই কম। আর এজন্যই আইসল্যান্ডকে ‘রুক্ষ দেশ’ বলা হয়। 

আইসল্যান্ডের মানুষ ইউরোপের যেকোনও দেশের মানুষের চেয়ে অধিক পরিশ্রমী। দেশটিতে ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘ কর্মসপ্তাহ পালন হয়। সেখানকার জনগণ সপ্তাহে ৪৩.৫ ঘণ্টা কাজ করেন।

দেশটির রাজস্বের বড় অংশ আসে তিমি মাছ প্রদর্শনী থেকে। তিনি মাছ প্রদর্শনে বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত দেশ আইসল্যান্ড।

বিশ্বের বহু ভ্রমণপিপাসু মানুষ সারা বছর এই আইসল্যান্ডে ঘুরতে আসে। সেখানকার রিসোর্টগুলোও বেশ দেখার মতো। নৈসর্গিক এই প্রকৃতিঘেরা বরফের ভূখণ্ডে একবার ঘুরে আসার সুযোগ হলে কে আর মিস করতে চাইবে! সময়, সুযোগ মতো প্রকৃতিপ্রেমী মানুষেরা এখানে ঘুরে আসতে পারেন। 

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2