শিরোনাম:

শেষইচ্ছা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত চান ভাষা সৈনিক লাইলী বেগম

মো.আমিনুল ইসলাম, ঝালকাঠি প্রতিনিধি
৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, শুক্রবার
প্রকাশিত: 7:08 আপডেট: 7:11
শেষইচ্ছা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত চান ভাষা সৈনিক লাইলী বেগম

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নেমে বুকের তাঁজা রক্ত দিয়েছিল। শহীদ হয়েছিল রফিক, শফিক, সালাম, বরকতসহ আরো অনেকে। সেই খবরটি ঝালকাঠিতে এসে পৌঁছে ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে। তখন ঝালকাঠির স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও ৫২’র ভাষা আন্দোলনে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল।
 
সেদিনের আন্দোলনের পুরোভাগে যারা ছিলেন তাদের অনেকেই আজ জীবিত নেই। এখনও যারা ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে বেঁচে আছেন কেউ তাদের খোঁজ নেয় না। তাদের মধ্যে জীবিত আছেন তৎকালীন ৭ম শ্রেণির ছাত্রী লাইলী বেগম (৭৬)।
 
লাইলী বেগম জানান, ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছি। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশও স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ভাসা সৈনিকদের কোনও স্বীকৃতি বা সম্মাননা মেলেনি। বয়স অনেক হয়েছে চলাফেরা করতেও অনেক কষ্ট হয়। যেকোনও সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি।
 
এজন্য মৃত্যুর আগে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করে কথার বলার শেষ ইচ্ছা পোষণ করেছেন তিনি।
 
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান, পাকিস্তানিদের চক্রান্তে মামলার স্বীকার হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালে ঝালকাঠিতে এসেছিলেন। তিনি ডাক বাংলোতে অবস্থান কালে আমি তার সাথে সাক্ষাত করতে যাই। দেখা হলে কিছুক্ষণ কথা বলার পরে পানির পিপাসার কথা বলেন। তখন টিউবয়েল থেকে জগ ভরে পানি এনে তাকে পান করাই। এজন্য সেই সময়ে তিনি আমাকে ধন্যবাদও দিয়েছিলেন।
 
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে আমাদের ভাষা সৈনিকদের জন্য একটা সম্মানের ব্যবস্থা করে দিতেন। আমিও তার কাছে গিয়ে ঝালকাঠির লাইলী বলে পরিচয় দিলে তিনি আমাকে চিনতেন। আমিও তার সাথে কথা বলতে পারতাম। এখন আমাকে কেউ চিনে না। তাই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাই।’
 
একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ঝালকাঠিতে কোনও কলেজ ছিল না, স্কুল পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীরাই সেদিন বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে রাজ পথে নেমেছিল। শাসক চক্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ১৭ ফেব্রুয়ারি স্কুল ছাত্রদের নিয়ে ৯ সদস্যের সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। কমিটিতে জহুরুল আমীন সভাপতি, আমীর হোসেন সহ-সভাপতি, মোহাম্মদ আলী খান সম্পাদক এবং সদস্য হিসেবে ছিলেন আমিন হোসেন, মোজাম্মেল হক, মরতুজ আলী খানসহ আরও তিন জন। তবে তাদের নাম তিনি মনে করতে পারেন নি।
 
সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে এখানকার স্কুলগুলোতে ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালনের চেষ্টা করা হলেও গ্রেফতারের ভয় দেখানোর ফলে তা সফল হয়নি। এদিন ঢাকায় গুলি বর্ষণের খবর পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে এখানে ছড়িয়ে পড়া মাত্রই উত্তেজিত ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পরে। স্থানীয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে প্রথম বারের মতো মিছিল বের হয়। মিছিলটি হরচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে পৌছলে ছাত্রদের কাছ থেকে ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর পাই।
 
৭ম শ্রেণির ছাত্রী লাইলি বেগমের নেতৃত্বে ছাত্রীরা বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেয়। মিছিলটি উদ্বোধন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাছে পৌঁছালে সেখানকার শিক্ষার্থীরাও এতে যোগদেয়। মিছিলের সম্মুখ ভাগে ছিলেন জনসাধারণের পক্ষে একমাত্র প্রতিনিধি সংবাদপত্রের এজেন্ট আবদুর রশীদ ফকির। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ এবং মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দানের স্বপক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে শহর প্রদক্ষিণ শেষে সরকারি বালিকা বিদ্যালয় মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
 
তিনি বলেন, ‘পরের দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি আমাকে বাসা থেকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা আমাকে ধরে নিয়ে যায়। ঝালকাঠি পৌরসভা সংলগ্ন ডাক বাংলোতে নিয়ে কর্মকর্তাদের সামনে হাজির করে আমাকে প্রশ্নবানে জর্জড়িত করেন। কে কে মিছিলে ছিলো? তাদের বাসা কোথায়? আমি সব জানা সত্ত্বেও কারোরই পরিচয় না দিয়ে আমি বলছিলাম কাউকেই আমি চিনি না। এসময় পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আমাকে লোভ দেখিয়ে বলেন যদি স্বীকার কর তাহলে অনেক টাকা দেয়া হবে। স্বীকার না করলে আমাকে ভয় দেখিয়ে বলেন, গুলি দিয়ে সুগন্ধা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হবে। আমি তখন দেশ মাতৃকার টানে কারও কোনও পরিচয় দেই নাই। এভাবে তারা দিনের পর দিন আমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে স্বীকারোক্তির জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। আমার একই কথা ছিলো. কাউকেই আমি চিনি না।’
 
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর আমার বিয়ে হয়পুলিশের এক হাবিলদারের সাথে। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অতন্দ্রভাবে সরকারি ডিউটি এবং বাকিটা সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ব্যয় করতেন। দেশের ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পুলিশের পরিকল্পনা জেনে তা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জানাতেন তিনি।’
 
তাদের ঔরশে ৮ মেয়ে ২ ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। সন্তানদের মধ্যে কারও কোনও ভালো চাকরি না থাকায় কোনমতে জীবনের বাকি সময়টা অতিবাহিত করছেন। তার মনের কষ্ট এখন একটাই দীর্ঘ ৬৬ বছরেও কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি, পাননি কোঁও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও।
 
ব্রেকিংনিউজ/আরএ

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2