শিরোনাম:

গবেষণা জালিয়াতিতে রাবি শিক্ষার্থীরা, শেষ আশ্রয় ফটোকপির দোকান

আবু সাঈদ সজল, রাবি করেসপন্ডেন্ট
৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, শনিবার
প্রকাশিত: 6:45
গবেষণা জালিয়াতিতে রাবি শিক্ষার্থীরা, শেষ আশ্রয় ফটোকপির দোকান

উচ্চ শিক্ষার প্রত্যেক স্তরেই বেশ গুরুত্ব প্রদান করা হয় মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের থিসিস। তবে সম্প্রতি এই গবেষণায় জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী। অন্যের থিসিস চুরি করে নিজের বলে চালিয়ে দিয়ে ডিগ্রি অর্জন করছে তারা। আর এর হাওয়া লেগেছে রাজশাহী বিশ্বেবিদ্যালয় (রাবি)তেও। রাবির মাস্টার্স পর্যায়ে গবেষণা জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে বড় একটি অংশ।

জানা গেছে, পূর্বে গবেষণা হওয়া বিষয় থেকেই হুবহু অনুকরণ করে বা আংশিক পরিবর্তন করে গবেষণা জালিয়াতি করছেন তারা। এভাবে গুরুত্ব হারিয়ে যাচ্ছে গবেষণার। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলেও দাবি করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ গবেষকগণ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের স্বাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ১০ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে থিসিস জালিয়াতির অভিযোগ উঠে। বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারভাইজারের চক্ষুগোচর হলে একই বর্ষের সকলের ফলাফল দিতে আপত্তি জানায় বিভাগের শিক্ষকগণ। পরে অবশ্য আবার থিসিস করার মাধ্যমে তাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করা হয় । এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের ২০০৭-০৮ সেশনের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে থিসিস জালিয়াতির অভিযোগ উঠে।

সূত্রে জানা যায়, গবেষণায় সময় স্বল্পতা, মার্কস কম থাকায় তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না এ গবেষণা। নিতান্তই এসাইনমেন্ট হিসাবে গুরুত্ব দেন অনেকে। তাই ফটোকপির দোকান থেকে বা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের গবেষণা করা বিষয় থেকে পুরো অনুকরণ বা আংশিক পরিবর্তন করে গবেষণার পেপার তৈরি করেন শিক্ষার্থীরা।

তাছাড়া শিক্ষকদের তদারকির অভাবে গবেষণা পেপারে কি কি বিষয় থাকবে সে বিষয়ে অনেক শিক্ষার্থীই পর্যাপ্ত জানেন না। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, গবেষণা কি সে বিষয়ে জানেন না অনেকে। তবে শিক্ষকদের দাবি অধিকাংশ শিক্ষার্থীই গবেষণার জন্য পরিশ্রম করতে চান না। তাই গবেষণায় জালিয়াতির আশ্রয় নেন তারা। এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুষদের ডীন আবু নাসের মো. ওয়াহিদ বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দেওয়া টপিক চেঞ্জ করে ফেলে শিক্ষার্থীরা। ক্লাস এসাইনমেন্ট সাদৃশ্য মনে করেন অনেকে। তাছাড়া ঢালাওভাবে মাস্টার্সের সকল শিক্ষার্থীর উপর থিসিসও অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে’।

এদিকে একই বিষয়ে দ্বিতীয়বার গবেষণা হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন অনেক গবেষক। এ প্রসঙ্গে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক সভাপতি ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে বলেন, ‘একই বিষয়ে বার বার গবেষণা হলে শিক্ষার্থীরা পূর্বের গবেষণা থেকে অনুকরণ করার সুযোগ পায়। এভাবে অনুকরণ করার মানসিকতা তাদের পরিবর্তন হয়না। গবেষণা জাতীয় সকল কাজে এভাবে অনুকরণ করে চালিয়ে যায় তারা’।

গবেষণা জালিয়াতি বন্ধের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিভিন্ন প্রযুক্তি এসেছে যা দিয়ে গবেষণা জালিয়াতি হচ্ছে কি হচ্ছে না সেটা পরীক্ষা করা যায়। সেটা ইংরেজি হোক বা বাংলা হোক। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বিভাগ পর্যায়ে এসব প্রযুক্তি সরবরাহ করেন এবং সেগুলো নিজস্ব তত্ত্বাবধায়নে রাখেন তাহলে হয়তো গবেষণা জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব’। 


বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে পূর্বের গবেষণা পেপারের সহজলভ্যতাকেও দায়ী করেন অনেকে। খোজ নিয়ে জানা যায়, গবেষণার পুরাতন পেপারগুলো শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটোকপির দোকানগুলো থেকে জোগার করছেন। সর্বনিম্ন ৩০০ টাকাতে বিক্রি হয় গবেষণার সফট কপি। চাহিদার সাথে গবেষণা পেপার মিলে গেলে টাকা বাড়তে থাকে। সেক্ষেত্রে ৫০০ টাকা বা  আরও উচ্চ মূল্যে বিক্রি হয় এসব গবেষণাপত্র।

অনুসন্ধানে জানা যায়, থিসিসের পুরাতন কপি বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়াম মার্কেট ও পরিবহন মার্কেটের দোকানগুলো থেকে গ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা। এরকম প্রায় ১৪-১৫টি দোকানে এই পুরাতন পেপার পাওয়া যায়। যদিও দোকানগুলোতে গোপনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতে হয়। কোন কোন দোকানে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে পুরাতন থিসিস পেপার পাওয়া যায়। আর কয়েকটি দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় থিসিস পেপারের ক্যাটালগ রয়েছে। তথ্যের প্রয়োজনে এই প্রতিবেদক ‘ভাই পুরাতন থিসিস পেপার পাওয়া যাবে? জিজ্ঞাসা করতেই ‘ভিতরে আসুন, কোন বিষয়ের? ক্যাটালগ আছে শিরোনাম দেখে খুঁজে নিন। সফট কফি বা হার্ড কপি উভয়ই পাওয়া যাবে।’ এমনই উত্তর দেয় দোকানি। 

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, থিসিস রয়েছে এমন প্রায় বিভাগেই গবেষণা জালিয়াতি হয়ে থাকে। এর মধ্যে বিজ্ঞান অনুষদ ও বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের থিসিস পেপারগুলো বেশি সরবরাহ হয় এই দোকান গুলো থেকে। শিক্ষার্থীরা চার্ট পরিবর্তন ও পরিসংখ্যান পরিবর্তন করেন এসব গবেষণা পেপার থেকে। কোন সময়ে টেবিল হিসাবে চার্ট দেওয়া থাকলে সেই চার্টকে বৃত্তে রুপান্তরিত করেন শিক্ষার্থীরা। এভাবে হাতের কাছেই পুরাতন গবেষণা পত্র পেয়েই গবেষণা না করে দোকানগুলো থেকে পাওয়া গবেষণাপত্র দিয়েই কাজ মিটিয়ে নেন শিক্ষার্থীরা।

এমন জালিয়াতি হলেও কোন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. বাবুল ইসলাম বলেন, ‘যদি মাস্টার্সের থিসিস জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে ঐ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে কমপক্ষে এক বছর বহিস্কারের আইন আছে’। 

এদিকে গবেষক তৈরির প্রথম ধাপেই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে গবেষণা হলে ভবিষ্যতে উন্নত গবেষণা বা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি আদৌ হবে কিনা সে ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যপক এ কে এম ইয়াকুব আলী বলেন, ‘জাতির জন্য একটা খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়ে গেছে যার প্রভাব সমাজে ইতমধ্যে দৃশ্যমান। এমন সস্তা গবেষণা হওয়ায় প্রকৃত জ্ঞান তলানীতে পড়ে যাচ্ছে। জ্ঞানের মূল্য কমে যাচ্ছে’।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) সদস্য প্রফেসর ড. দিল আফরোজ বেগম বলেন, ‘উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এটা কাম্য নয়। জাতির জন্য এটা খুবই হতাশাজনক। বিষয়টি জেনে রাখলাম, এর পরে ভিসিরা আসবেন তখন বিষয়টি তাদের অবহিত করা হবে’।

ব্রেকিংনিউজ/জেআই

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2