শিরোনাম:

‘নেতারাই শ্রমিকের ভাগ্যোন্নোয়নে বড় বাধা’

রাহাত হুসাইন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 6:20 আপডেট: 12:53
‘নেতারাই শ্রমিকের ভাগ্যোন্নোয়নে বড় বাধা’

সুলতানা বেগম। একজন শ্রমিক নেত্রী। দুই দশকের বেশি সময় ধরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছেন। ১৯৯২ সালে মিরপুরে অবস্থিত ডেকো গার্মেন্টস লিমিটেডে হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ মুক্ত গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিয়ন নামের সংগঠনের হাত ধরেই শ্রমিক ইউনিয়নে যাত্রা শুরু হয় তার। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় তিনি জাতীয় গার্মেন্টস  শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম- সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে সুলতান বেগম গ্রিন বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন নামে একটি গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনেরও সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিশ্বের ১৯টি দেশে ভ্রমণ করেছেন তিনি।

সম্প্রতি গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর মুখোমুখি হয়েছেন সুলতানা বেগম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি এর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট রাহাত হুসাইন।

ব্রেকিংনিউজ: গার্মেন্টস খাতের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকরার পরও এ খাতের শ্রমিকরা কেন অবমূল্যায়িত হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

সুলতান বেগম : গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি ও এ খাতের শ্রমিকরাই বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন। গার্মেন্টস শ্রমিকদের আয়ের টাকা আসে ডলার হিসেবে আর তারা বেতন পান আমাদের দেশের টাকার হিসাবে। বৈষম্য এখানেই। দেশের ইতিহাসে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান বাসাবাড়ি থেকে উঠে এসেছে। কোনও শিল্প হিসাবে গড়ে ওঠেনি। গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানকে শিল্পে রূপান্তর করতে গিয়েই শ্রমিকদের ঠকানো হচ্ছে। শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরি দেয়া হচ্ছে না। ২০০৬ সালের শ্রম আইন বাস্তবায়ন হলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন হতো।

আপনারা জানেন, গার্মেন্টসে শতকরা ৮০ ভাগ নারী শ্রমিক কাজ করেন। মা শ্রমিকের জন্য প্রতিটা ইন্ডাস্ট্রিতে শিশু দিবাকেন্দ্র থাকার কথা থাকলেও কয়টা প্রতিষ্ঠানে এগুলো আছে? আসলে মালিকরা শ্রম আইন মেনে প্রতিষ্ঠান চালাতে চান না। আমরা শ্রম আইন মেনে প্রতিষ্ঠান চালাতে বললে মালিকপক্ষ মানতে চায় না। যখন বিদেশি ক্রেতারা বলেন তখন তারা বাধ্য হয়ে কিছুটা মেনে নেন।’

ব্রেকিংনিউজ : গার্মেন্টস শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১৬ হাজার টাকার যৌক্তিক দাবি কতটুকু বাস্তবায়নের পথে?

সুলতান বেগম : শ্রমিকদের এই দাবি নিঃসন্দেহে যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। ১৬ হাজার টাকা আমাদের ন্যায্য দাবি। পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় আমাদের এ দাবি অনেক কম। ১৬ হাজার টাকা থেকে কমানোর চেষ্টা করলে শ্রমিকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে দু'বেলা, দু’মুটো ডাল-ভাত খেয়েও বাঁচতে পারবে না। তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া হবে না। আগামীর প্রজন্ম পূর্বের ন্যায় অশিক্ষিত- অর্ধশিক্ষিত হয়ে পড়বে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে শ্রমিকদের ছেলে- মেয়েদের প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা অর্জন করাতে হবে। এত অল্প টাকা বেতন হলে এটা সম্ভব হবে না।

শ্রম আইনের সংশোধনের ব্যাপারে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারী ও রফতানিকারক সংগঠনের (বিজিএমইএ) নেতারা, শ্রমিক নেতাদের প্রলোভন দেখাচ্ছে। আমাদেরকেও ডেকেছিল। আমরা স্পষ্ট বলে দিয়েছি ১৬ হাজার টাকা আমাদের ন্যায্য দাবি। ১৬ হাজার টাকার এই দাবি বাস্তবায়নে শ্রমিকদের ৬২টি সংগঠন একত্রে কাজ শুরু করেছিল। এখন আবার অনেকে সংগঠন পৃথক হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে আমরা অনেকেই হতাশ। কিছু কিছু শ্রমিক নেতাদের কারণেই শ্রমিকদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয় না। নেতারাই শ্রমিকদের ভাগ্যোন্নয়নের পথে বড় বাধা।

ব্রেকিংনিউজ:  সংশোধিত শ্রম আইন কতটা শ্রমিকবান্ধব বলে আপনি মনে করেন?

সুলতান বেগম :  সংশোধিত শ্রম আইন শ্রমিক বান্ধব নয়, এটা কালো আইনে পরিণত হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলাপ না করেই এই আইন সংশোধন করা হয়েছে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী শ্রমিকরা মাতৃকালীন ছয় মাসের ছুটি পান। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকরা চার মাসের ছুটি পান। একই দেশে নারী শ্রমিকদের জন্য দুই ধরনের আইন চলতে পারে না। মাতৃকালীন ছুটি ৬ মাস করার জন্য আমরা বারবার বলছি। কিন্তু এটা সংশোধনীতে আনা হয়নি।
আবার ক্ষতিপূরণের ধারায় আগে ছিল যদি কোনো শ্রমিক কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান, তাহলে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হতো। এখন এক লাখ টাকার পরিবর্তে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া কথা বলা হয়েছে। এটা বাহ্যিক দৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও আমরা চেয়েছিলাম লস অব আর্নিং এর ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ। এটাও মানা হয়নি।

ব্রেকিংনিউজ:  শ্রমিকদের অবসর ভাতা সংক্রান্ত সরকারি কোনো পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ বলে মনে করনে কিনা?

সুলতান বেগম : অবশ্যই, শ্রমিকদের অবসরকালীন ভাতার জন্য সরকার বড় ধরনের ভূমিকা নেবে বলে আমি মনে করি। আমরা বেসরকারি খাতের শ্রমিকরাও অবসরকালীন ভাতা চাই।

ব্রেকিংনিউজ : দেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কোনো তালিকা বা ডাটাবেজ রয়েছে কিনা?

সুলতান বেগম : আমার জানা মতে দেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কোনও ডাটাবেজ নেই। আমরা বিজিএমই-এর তালিকা থেকেই শ্রমিকদের সংখ্যা উল্লেখ করে থাকি।
ব্রেকিংনিউজ : একদশ জাতীয় নির্বাচনে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ভূমিকা বা অবস্থান কী হতে পারে?

সুলতান বেগম : নির্বাচন আসলেই অনেকেই শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নের কথা বলে থাকেন। ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন আর অক্টোবরে আমাদের ১৬ হাজার টাকা দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তা বাস্তবায়ন হবে ডিসেম্বর।  শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়ন হলে আমরা সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেবো। আর তা বাস্তবায়ন না হলে নির্বাচন রেখে শ্রমিকরা ডিসেম্বরই আন্দোলনে যেতে পারে।

 শ্রমিকবান্ধব প্রতিনিধি সংসদে না থাকায় শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা হচ্ছে না। ওয়ার্কাস পার্টি সংসদে থাকলেও তাদের ভূমিকা জোরালো নয়। তারা যদি ভূমিকা রাখতেন তাহলে শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী আইন পাস হয় কী করে? আর যারা শ্রমিকবান্ধব নেতা পরিচয় দিয়ে সংসদে রয়েছেন তারা এসির বাতাস খেয়ে সবকিছু বেমালুম ভুলে গেছেন। তারা তাদের আদর্শ থেকে বেরিয়ে এসেছেন। একটা সময় প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধি সংসদে যাবে, আমরা এটাই প্রতিষ্ঠা করবো।

ব্রেকিংনিউজ : এ সময়ের শ্রমিক আন্দোলনগুলো কি বিচ্ছিন্ন?

সুলতান বেগম : এ সময়ের শ্রমিক আন্দোলনগুলোকে একদিক থেকে বিচ্ছিন্ন বলা যেতে পারে। মালিকপক্ষ নিজেদের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকলেও শ্রমিক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ নয়। শ্রমিক সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন থেকে সরে যাচ্ছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভুলে গিয়ে মালিকপক্ষ নিজেদের স্বার্থে ঐক্য টিকিয়ে রেখেছে। আবার শ্রমিক সংগঠনগুলো একই দাবিতে পৃথক পৃথক কাজ করছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো ঐকবদ্ধ হলে শ্রমিকদের স্বার্থ দ্রুত বাস্তবায়িত হবে বলে আমি মনে করি।

ব্রেকিংনিউজ : সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।

সুলতান বেগম : আপনাকে ও ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি পরিবারকেও ধন্যবাদ।

ব্রেকিংনিউজ/আরএইচ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2