শিরোনাম:

জাবিতে ‘শিক্ষক রাজনীতিতে’ জিম্মি শত শত শিক্ষার্থী

মাহবুব আলম, জাবি করেসপন্ডেন্ট
১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: 6:33 আপডেট: 9:17
জাবিতে ‘শিক্ষক রাজনীতিতে’ জিম্মি শত শত শিক্ষার্থী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে শিক্ষক রাজনীতির যাতাকলে বন্ধ রয়েছে বিভাগের সব ধরনের ক্লাস-পরীক্ষা। ঠুনকো অজুহাতে ১০ দিন ধরে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না বিভাগের শিক্ষকদের একটি প্রভাবশালী গ্রুপ। আর তাতেই যুক্ত হয়েছে অন্য সব শিক্ষকরা। ফলে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জিম্মি হয়ে ছাত্রজীবন নিয়ে শঙ্কার রয়েছে বিভাগের প্রায় সাড়ে তিনশ শিক্ষার্থী। ঝুলে রয়েছে বিভাগের ৪২ ব্যাচের স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ বছরের ২৬ জুলাই আদালতের নির্দেশনায় বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন অধ্যাপক মো. মনজুরুল হাসান। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে অন্তত একটি একাডেমিক কাউন্সিলের সভা হওয়ার কথা। কিন্তু সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পরে অধ্যাপক মনজুরুল এখনো কোন সভা ডাকেনি। 

বিভাগের শিক্ষকদের দাবি, একাডেমিক কাউন্সিলের সভা হওয়ার আগে তারা কোন ধরনের ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেবেন না। তবে সভাপতির বক্তব্য, আমার দায়িত্ব বুঝে নিতে একটু সময় লাগছে। তাই যৌক্তিক সময়ে আমি এ সভা আহবান করবো। কিন্তু বিভাগের শিক্ষকরা তাদের দাবিতে অনড় অবস্থানের রয়েছেন। ফলে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জিম্মি হয়ে পড়েছে বিভাগের শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন বিভাগের গিয়ে ক্লাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এমনকি শিক্ষকদের প্রভাবে তারাও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। এছাড়া বিভাগের সান্ধ্যকালীন কোর্সের ক্লাস-পরীক্ষাও বন্ধ রয়েছে ।  

তবে শিক্ষকদের এ কোন্দল শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের শেষের দিকে। তখন বিভাগের ৩৭ তম ব্যাচের স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক মনজুরুল হাসান। নির্দিষ্ট সময়ে তিনি এ পরীক্ষা শুরু করতে পারেনি। তাই বিভাগের একাডেমিক সভা থেকে এ দায়িত্ব থেকে তাকে অপসারণ করা হয়। এতে নমজুরুল হাসান বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। আর এ ঘটনায় বিভাগীয় সভায় তাকে ২০১৫-১৬ শিক্ষা বর্ষের ভর্তি পরীক্ষাসহ বিভাগের সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। 

এছাড়া তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবদুল জব্বার হাওলাদারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অধীনে একটি স্ট্রাকচারাল কমিটি গঠন করে প্রশাসন। জানা যায়, এই স্ট্রাকচারাল কমিটি কোন কার্যকরী তদন্ত ও প্রতিবেদন জমা দেয়নি। 

কমিটির তদন্ত চলাকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩ অ্যাক্টের ৯(১) ধারা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর অধ্যাপক মনজুরুল হাসানের ওপর বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব আসে। কিন্তু তদন্ত প্রক্রিয়াধীন থাকায় তাকে এ দায়িত্ব না দিয়ে অধ্যাপক মো. শাহেদুর রশিদকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অধ্যাপক মনজুরুলকে কেন সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হল না এ মর্মে তিনি নিজেই ৩১ অক্টোবর-১৬ তারিখে হাইকোর্টে আরেকটি রিট করেন। এর আগে তার বিরুদ্ধে আনীতি অভিযোগ ও নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি ৭ নভেম্বর-১৫ তারিখে কয়েকজন ‘বহিরাগত’ নিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়। 

বিভাগীয় শিক্ষকরা এ বিজ্ঞপ্তিটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও উস্কানিমূল উল্লেখ করে তাদের নিরাপত্তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কে থানায় সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করতে বলে । কিন্তু ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত জিডি না করায় ১৫ নভেম্বর বিভাগীয় সভায় সকল ধরণের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেয়। 

শিক্ষকদের এই রাজনীতির মুখে ভোগান্তিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা। তাই শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক মনজুরুল হাসানকে অপসারণ ও ক্লাস-পরীক্ষা নিয়মিত করার দাবিতে রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে অবস্থান ধর্মঘট সহ নানা কর্মসূচি পালন করে।

সর্বশেষে, অধ্যাপক মনজুরুল হাসানকে সভাপতির পদে দায়িত্ব দিতে ২২ জুলাই হাইকোটের্র একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়। আর ২৬ জুলাই দায়িত্ব নিয়েই তিনি ‘হঠকারী’ আচরণ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ বিভাগের অন্য শিক্ষকদের।

বিভাগের অন্তত ১০ জন শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, অধ্যাপক মনজুরুল হাসানকে বিভাগ থেকে দীর্ঘ দিন সরিয়ে রাখার পর তিনিই আবার  হাইকোর্টের নির্দেশে সভাপতির দায়িত্বে এসেছেন। তাই তিনি বিভাগীয় শিক্ষকদের ওপর প্রতিশোধ পরায়ণ আচরণ শুরু করে একাডেমি সভা ডাকছেন না। তাই বিভাগের শিক্ষকদের নতুনভাবে কোর্স বন্টন করা সম্ভব হচ্ছেনা। এছাড়া ২০১৮-১৯ সেশনের ভর্তি পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও ঝুলে আছে। 

এদিকে বিভাগের সকল বিভাগের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ৪২ ব্যাচের স্নাতকোত্তরের চুড়ান্ত পরীক্ষার লিখিত পরীক্ষা ১৬ আগস্ট শেষ হলেও এখনো প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করেনি বিভাগটি। নিয়ম অনুযায়ী এ মাসের ৪ তারিখ থেকে তাদের এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

বিভাগের শিক্ষকদের সাথে কথা বলে আরো জানা যায়, যদি সভাপতি একাডিমিক সভা না ডাকেন তবে অচিরেই তার বিরুদ্ধে রিকুইজিশন আহবান করবেন। এমনকি শিক্ষকরা তার অবসারণের দাবিতে আবারো টানা আন্দোলনে যাবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাবির ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে। বর্তমান সভাপতি উপাচার্য পন্থী বলে পরিচিত। আর বাকি গ্রুপগুলো অধিকাংশই উপাচার্যের বিরোধী। এমনকি সবচেয়ে বড় ও বিভাগের প্রভাবশালী গ্রুপটিও উপাচার্য বিরোধী। তাই প্রভাবশালী গ্রুপের বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে অবস্থান থাকায় বিভাগের সব শিক্ষকদের অবস্থান ওই দিকে। কিন্তু সভাপতিকে মাত্র দুজন শিক্ষক প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছেন। বিভাগের নিরপেক্ষ শিক্ষকদের দাবি, সভাপতি যদি এভাবে বিভাগ চালাতে থাকে তবে তাকে অপসারণের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

আগে সিন্ধান্ত হওয়া পরীক্ষা কেন সম্পন্ন করছেন না- এমন প্রশ্নে ৪২ ব্যাচের পরীক্ষা কমিটির সভাপতি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘যেহেতু যৌক্তিক দাবিতে সকল শিক্ষকরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছে। তাই আমি তাদের বাহিরে যেতে পারিনা।’

এসব বিষয়ে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. মনজুরুল হাসান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘ক্লাস-পরীক্ষা নিবে না বলে তারা আমাকে লিখিতভাবে জানায়নি। শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে যদি শিক্ষকরা ক্লাস-পরীক্ষা না নেয় তবে সেটা হবে অমানবিক ‘ তিনি আরো বলেন, ‘আমি বিভাগের সব কিছু বুঝে ‘যৌক্তিক সময়ে’ একাডেমিক সভা আহবান করবো।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নুরুল আলম বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, যেন শিক্ষার্থীরা ভোগান্তির শিকার না হয়।’ 

ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি/এমএ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2