লোভের থাবায় ক্ষত-বিক্ষত পদ্মা, অবশেষে বালু উত্তোলন বন্ধ

সরকার দুলাল মাহবুব, রাজশাহী
২৪ জানুয়ারি ২০২০, শুক্রবার
প্রকাশিত: ০৮:৫৩

লোভের থাবায় ক্ষত-বিক্ষত পদ্মা, অবশেষে বালু উত্তোলন বন্ধ

রাজশাহীর পদ্মা নদীর তীরবর্তী নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় দুটি বালুমহাল বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। এর ফলে বালুমহাল দুটি থেকে বালু উত্তোলনও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে লাল পতাকার ঝান্ডা।
 
রাজশাহী জেলা প্রশাসকের আদেশক্রমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন পবা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবুল হায়াত।
 
জানা গেছে, বালুমহাল দুটির মালিকানায় রয়েছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা রজব আলী ও আনোয়ার হোসেন। এর মধ্যে রজব আলী হাইটেক পার্ক ঘেঁষে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছিলেন।
 
সরেজমিনে দেখা গেছে, বালুমহাল ইজারাদারদের লোভের থাবায় এখন ক্ষত-বিক্ষত রাজশাহীর পদ্মার বুক। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করতে গিয়ে ইজারা শর্ত লঙ্ঘন করছেন তারা। শুধু তাই নয়, বালু পরিবহনের জন্য নদীর বুকে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। আর এসব বালু পরিবহনের কারণে নষ্ট  হচ্ছে নদীতীরবর্তী এলাকার পরিবেশ। চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। প্রশাসনের তদারকির অভাবে এতদিন নদীও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে। অপরিকল্পতভাবে বালু তোলায় এখন ক্ষতির মুখে পড়েছে কয়েকশো কোটি টাকা  ব্যয়ে নির্মিত নদীর তীর রক্ষা বাঁধ। এ অবস্থায় নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষও দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নানা কারণে বালুমহাল সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও পারছেন না। নদী বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন এভাবে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলা বন্ধ করা না হলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শহর রক্ষা বাঁধ কোন কাজে আসবে না। ফলে এর প্রভাব পড়বে সুদুরপ্রসারী।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী শহর ঘেঁষে ১৭ কিলোমিটার শহর রক্ষা বাঁধ রয়েছে। যা নির্মাণে খরচ হয়েছে হাজার কোটি টাকা। সদ্যসমাপ্ত নগরীর পশ্চিমে প্রান্তের বুলনপুর-সোনাইকান্দি এলাকার নদী তীরবর্তী চার কিলোমিটার বাঁধ তৈরি করা হয়। যাতে খরচ হয় ২৬৬ কোটি টাকা। তবে বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলায় সেই বাঁধ নষ্ট হচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রতিবেদন পেশ করেছে। হাইকোট থেকে ওই এলাকায় বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এর পরও বন্ধ হয়নি বালু উত্তোলন। 
এদিকে, রাজশাহীতে মাঝ পদ্মায় বিশাল চর জাগলেও কয়েক বছর আগে পানি প্রবাহ ছিল নগরের কুল ঘেঁষে। থাকতো সারা বছর পানি। চরে যেতে প্রয়োজন হতো নৌকা। এছাড়াও চরে বিভিন্ন আকারের দামোস (চারিধারে বালু মাঝখানে পানি) ছিল। পদ্মার আংশিক এই জলাধারে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন জেলেরা।
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বালু উত্তোলনের কারণে শুকিয়ে গেছে সেই জলাধারা। এখন আর চরে যেতে প্রয়োজন হয় না নৌকা। মাছ ধরে না জেলেরাও। নগরের তালাইমারি জাহাজ ঘাট, কুমারপাড়া, বড়কুটি, দরদাপাড়া ও বুলনপুর এলাকায় এই জলধারা শুকিয়ে গিয়ে তৈরি হয়ে গেছে রাস্তা। সেখান দিয়ে লোকজন চরে যাতায়াত করছেন। মূলত: উজানের মুখে বাঁধ দেয়ার কারণে নগর ঘেঁষে যাওয়া এই জলধারাটি শুকিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এতে নগরের পরিবেশের উপরও প্রভাব বড়ছে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।
 
রাজাশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবাধায়ক প্রকৌশলী আমিরুল হক ভূঞা বলেন, নগরের কুল ঘেঁষে যে জলাধারা প্রবাহিত হয় তার মুখ সোনাইকান্দি এলাকায়। কিন্তু বালু উত্তোলনের জন্য সোনাইকান্দি ও নবগঙ্গা এলাকায় দুইটি বাঁধ দেওয়া হয়েছে চরে ট্রাক নামানের জন্য। এ কারণে মূলত এই জলধারাটি শুকিয়ে তালাইমারি জাহাজ ঘাট পর্যন্ত রাস্তা জেগে গেছে। যেখান দিয়ে লোকজন এখন পায়ে হেটে চরে যাতায়াত করছে।
 
রাজশাহী পরিবেশ আন্দোলন ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা মাহফুজুর রহমান বলেন, পদ্মার শহর ঘেঁষে যে আংশিক জলধারা প্রবাহিত হচ্ছিল তা কেন শুকিয়ে গেছে তা জানতে পরিবেশ আন্দোলনের পক্ষ থেকে কয়েকজন সরজমিনে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে সোনাইকান্দি এলাকায় এই জলধারার মুখ। সেখানে বাঁধ দেওয়া হয়েছে চারে ট্রাক নামানোর জন্য। এর পর নবগঙ্গা এলাকায় আরেকটি বাঁধ দেওয়া হয়েছে একইভাবে। যে কারণে সোনাইকান্দি থেকে তালাইমারি পর্যন্ত নগর ঘেঁষে যাওয়া জলধারা শুকিয়ে যাচ্ছে।
 
তিনি বলেন, পদ্মা নগর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সরে গেছে। যার প্রভাব রাজশাহীর পরিবেশের উপর পড়তে শুরু করেছে। নগর ঘেঁষা জলধারায় পানি প্রবাহ রাখতে পারলে রাজশাহীর পরিবেশের আরও উন্নত হবে বলে মনে করেন এই পরিবেশবিদ।
 
রাজশাহী নগরের দক্ষিণের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে বিস্তীর্ণ পদ্মা নদী। রাজশাহী নগরীসহ গোদাগাড়ী, পবা, চারঘাট, বাঘা উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা নদীর মোট ১১টি পৃথক পয়েন্ট বালুমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, রাজশাহী জেলা প্রশাসন নদীর এই পয়েন্টগুলো ইজারা দিয়ে সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় করেছেন ২৫ কোটির টাকা। তবে এ বিষয়ে কোন তথ্য দিতে চায়নি জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দফতর। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম তারিখে এক বছরের জন্য এই বালুমহালগুলো সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হয়।

ইজারা শর্তানুয়ায়ী নিরাপত্তার কারণে নদীর বাঁধের দুই কিলোমিটারের মধ্যে বালু তোলা নিষিদ্ধ থাকলেও ইজারাদাররা সেই নিষিদ্ধ সীমানার মধ্যেই বালু তুলছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসলে সর্বশেষ গত ১৪ জানুয়ারি টি-বাঁধের পশ্চিমে পবা উপজেলার চরহরিপুর ও নবগঙ্গা মৌজার দুইজন বালুর ঘাট ইজারাদার রজব আলী ও আনোয়ার হোসেনের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ হাজার করে মোট একলাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে ওইদিন পবা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবুল হায়াত এই দুই বালুমহালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
 
সেদিন ইজারাদার রজব আলী ও আনোয়ার হোসেন জরিমানার এক লাখ টাকা দিলেও তাদের অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করেন নি। যার প্রেক্ষাপটে আজ (২২ জানুয়ারী) দুপুরে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের আদেশক্রমে বালুমহাল দুটি বন্ধ করে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেন পবা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবুল হায়াত।
 
এর আগে গত বছর কাজলা মৌজা থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার অভিযোগে ওই বালুঘাটের ইজারাদার আজিজুল আলমের কাছ থেকেও জরিমানা আদায় করা হয়। এসময় জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সেখানে বালু উত্তলন বন্ধ করে দেন। এছাড়া নদীর প্রবাহ রোধ করে বালু পরিবহনের জন্য যাতায়াতের রাস্তা তৈরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
 
রাজশাহী নগরী ও এর আশপাশে নদী তীরবর্তী বালুমহাল ঘুরে দেখা গেছে, নিয়ম অমান্য করে প্রকাশ্যে নদী তীরবর্তী বাঁধের কোল ঘেঁষে বালু তোলার হিড়িক পড়েছে। কোন কোন বালুমহাল সংশ্লিষ্টরা সেই বালু তুলে সংরক্ষণ করছেন বাঁধের ওপর। এখানেই শেষ নয়, শুকিয়ে যাওয়া নদীর বুকে খালের মত সৃষ্ট জলাধার দিয়ে যে সামান্য পানি প্রবাহিত হচ্ছে, তাও বন্ধ করে ইট-খোয়া ও রাবিশ ফেলে নদীর মাঝে রাস্তা তৈরি করে ট্রাক নামিয়ে বালু পরিবহন করা হচ্ছে।
 
নদী বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্যমতে, বর্ষা মৌসুমে ভারত থেকে নেমে আসা ঢল প্রতিরোধের জন্য পদ্মার বুকে আই-আকৃতির বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। যাতে বাঁধগুলোর পশ্চিম পাড়ে পলিমাটি বা বালু জমে। এই পলিমাটি বা বালি খরস্রোতা নদীর স্রোতের তীব্রতা থেকে তীরবর্তী এলাকাকে রক্ষা করে এবং নদীর তীব্র স্রোত তীরের দিক থেকে মাঝ নদীর দিকে সরিয়ে দেয়। অথচ তীর রক্ষার পরিকল্পিত সেই বালুই তুলে ফেলা নেওয়া হচ্ছে। এদিকে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে বাঁধের উপর পাহাড় গড়ে তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সেই বালু থেকে দিন-রাত পানি ঝরছে। ফলে বাঁধ এলাকার মাটি ও সংস্কার করা বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, পদ্মানদীর ১১টি পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাকে বালু ভর্তি করে দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতের ফলে রাস্তাগুলো ভেঙে পড়েছে। সেই রাস্তা ব্যবহারকারী এলাকাবাসীকে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। এই রাস্তাগুলো নির্মাণে প্রায় ৬ থেকে সাত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এই বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। রাস্তাগুলো ভেঙে পড়ায় জনদুর্ভোগ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।
 
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান জানান, নদী তীর সংরক্ষন করে বালু তোলায় কোন সমস্যা নেই। তবে প্রশাসনের পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে বালুমহাল সংশ্লিষ্টরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বালু উত্তোলন করছেন। শহর অংশের নদী থেকে বালু না তোলা করার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে রাজশাহীর চার প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করছে পুরো পদ্মানদী। বালুর লোভে তারা এখন অন্ধ হয়ে গেছে। পরিবেশ ও নদীর কথা না ভেবে প্রতিনিয়ন নদীবক্ষ ক্ষত-বিক্ষত করছেন। যদিও এসব বালু ব্যবসায়ীদের দাবী তারা শর্ত মেনে বালু উত্তোলন করছেন। তবে বালু উত্তোলনের প্রেক্ষাপট একেবারে উল্টো।
 
ব্রেকিংনিউজ/এসডি/এমএইচ

breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
 Monetized by Galaxysoft
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি