মাত্র ৪ দিনেই তিস্তায় বিলিন সিংগিমারী গ্রাম!

নুুুরনবী সরকার, লালমনিরহাট
৫ আগস্ট ২০২০, বুধবার
প্রকাশিত: ০৭:১৩

মাত্র ৪ দিনেই তিস্তায় বিলিন সিংগিমারী গ্রাম!

তিস্তার বাম তীরের কিছুটা দুরেই গাছপালা আর ফসলে ভরা ছিল সিংগিমারী গ্রাম। বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত ছিল গ্রামটির অর্ধ সহস্রাধিক পরিবার। মাত্র ৪ দিনের ব্যাবধানে তিস্তার হিংস্র স্রোতে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে গ্রামটি।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের দক্ষিন বালাপাড়ায় ছিল  সিংগিমারী গ্রাম। ৪ দিনের ব্যাবধানে আজ তা তিস্তা নদীতে পরিনত হয়েছে। ঈদে আনন্দে সারা বিশ্ব মেতে উঠলেও এ গ্রামে ছিল কান্নার রোল। গৃহহীনদের কান্নায় গ্রামটির বাতাস ভাড়ি হলেও কর্তৃপক্ষের নজরেই আসে নেই। ফলে গৃহহীনরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। ভাঙন আতংকে দিন কাটছে পাশের দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামের মানুষের। শুধু সিংগিমারী গ্রাম নয়, তিস্তার বাম তীরে গত দুই মাসে জেলার ৫টি উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার পরিবার তিস্তার ভাঙনের শিকার হয়েছেন। তবে পুনবাসনের সহায়তা দিতে  সরকারী ভাবে মাত্র ২০৭টি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের তালিকা করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, চলতি মৌসুমে টানা কয়েক দফায় বন্যায় ফসল নষ্টের পাশাপাশি পানিবন্দি থাকায় সঞ্চিত অর্থে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করেছে তিস্তার বামতীরে লালমনিরহাটের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার। সেই ভয়াবহ বন্যার ধকল কাটতে না কাটতেই তিস্তার রুপ পাল্টে আগ্রাসী আচরন শুরু করে। পানি কমে যাওয়ায় তিস্তার ভাঙন তীব্র থেকে তীব্র আকার ধারন করে। মুহুর্তে ভেঙে যায় মাঠের পর মাঠ, ফসলি জমি আর প্রিয় বসতভিটা। চোখের সামনে সাজানো ঘরবাড়ি তিস্তায় বিলিন হওয়ায় কান্নার রোল পড়ে তিস্তা পাড়ে।

গত ঈদের আগের রাতে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়ে সিংগিমারী গ্রাম। রাতেই ঘর বাড়ি সড়াতে বাধ্য হন গ্রামবাসী। লোকজন আর পরিবহনের নৌকার অভাবে ৫/৭টি ঘর ও আসবাবপত্র  তিস্তার স্রোতে ভেসে গেছে। গ্রামটির এন্তাজ ও মোকছেদসহ অনেকের ঘর বাড়ি তিস্তায় ভেসে গেছে। রক্ষা করতে পারেনি সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সর্বশেষ একমাত্র আব্দুল্লার বাড়িটিও মঙ্গলবার(০৪ আগস্ট) তিস্তায় বিলিন হয়েছে। এখন সিংগিমারী গ্রামটি তিস্তার স্রোত ধারায় পরিনত হয়েছে। কেউ কেউ চেষ্টা করে ঘর খুলে পাশের ঈদগা, স্কুল মাঠ ও রাস্তার পাশে স্তুুপাকারে রেখেছেন। জমির অভাবে ঘর তুলতে পারছেন না ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থরা। চরা দামে ভাড়ায় জমি পাওয়া গেলেও তার মুল্য যোগানো অনেকের সাধ্যের বাহিরে। তাই ঈদগা মাঠ বা রাস্তার পাশে পলিথিন সাঁটিয়ে অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এমন চিত্র জেলার ৫টি উপজেলার তিস্তার বাম তীরের গ্রামগুলোতে।

তিস্তার বাম তীরে সলেডি স্প্যার বাঁধ ১ এবং ২ এর মধ্যবর্তি অংশে গত এক মাস ধরে ভাঙনের মুখে পড়ে শত শত পরিবার বিলিন হয়েছে। দুইটি বাঁধের মধ্যবর্তি অংশে হঠাৎ ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়ে ঝুঁকিপুর্ন হয়ে পড়েছে সলেডি স্প্যার বাঁধ ২ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ(ওয়াব্দা)। বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক হাজার হেক্টর ফসলে ক্ষতিসহ ভাঙনের মুখে পড়বে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কয়েক হাজার পরিবার। সিংগিমারী গ্রাম বিলিন হয়ে ভাঙনের মুখে পড়ে দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রাম।

ভাঙন রোধে জরুরী ভাবে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে সোমবার(৩ আগস্ট) নদীর তীরে মানববন্ধন করেছে বালাপাড়া গ্রামের সহস্রাধিক মানুষ। গ্রামটি ও বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ রক্ষায় জরুরী ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা। একই সাথে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থদের উপযুক্ত পুনবাসনের দাবি জানানো হয় মানববন্ধনে।

ভাঙনের শিকার সিংগিমারী গ্রামের আজিজুল ইসলাম বলেন, সগায়(সবাই) ঈদের নামাজ পড়েছে আর হামরা(আমরা) ঘর বাড়ি সড়িয়ে নিয়েছে। তার পরেও অনেকের ঘর ও জিনিসপত্র পানিতে ভাসি গেইছে। সড়বার পাই নাই। এখন ঘর তুলে থাকবার কোন জমি নাই। ছাওয়া পোয়া(ছেলে মেয়ে) নিয়া কোনটে যাই? কায় জায়গা দিবে?।

ওই গ্রামের এন্তাজ বাউদিয়া বলেন, ঘর তো একাই সড়ানো য়ায় না। লোকজন আর নৌকা খুঁজতে খুঁজতে দুইটা ঘর জিনিস পত্রসহ নদীতে ভেসে গেছে। কিছুই বাঁচাতে পাই নাই। হামরা গরিব মানুষ। হামার ভিতি(আমাদের দিকে) কায়ো দেখে না ভাই। হামরা রিলিপ চাই না। নদী বান্দি(বাঁধ) দিলে হামরা কামাই(রোজগার) করি খামো। হামরা সরকারের কাছোত আর কিছু চাই না।

পাশে দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামের শিক্ষক আব্দুল্লাহ বলেন, তলদেশ ভরাট হওয়া  তিস্তার ডান তীরে স্থায়ী বাঁধ থাকায় বাম তীরে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে তিস্তা প্রতি বছর বামতীরের লোকালয়ে প্রবেশ করে মুল স্রোতধারার গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। মাত্র ৪ দিনে সিংগিমারী গ্রাম নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে। দ্রুত বাঁধের ব্যবস্থা না করলে চলতি মাসেই দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ কয়েক হাজার পরিবার নদীগর্ভে বিলিন হবে। তাই জরুরী ভিত্তিতে বাঁধ নির্মানের দাবি জানান তিনি।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ ২০৭টি পরিবারকে পুনবাসনের জন্য পরিবার প্রতি৭ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে। ঈদের পরে ভাঙনের শিকার পরিবারের তালিকা করতে উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিপুর্ন এলাকায় কাজ চলমান রেখেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বালাপাড়া গ্রাম রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে। তারা নদীপাড় পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নিবেন।

ব্রেকিংনিউজ/এসপি

breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি