ভ্যাকসিনের সুরক্ষা তথ্য নিয়ে লুকোচুরিতে বাড়ছে উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, বুধবার
প্রকাশিত: ০৯:৩৩ আপডেট: ১০:৪২

ভ্যাকসিনের সুরক্ষা তথ্য নিয়ে লুকোচুরিতে বাড়ছে উদ্বেগ

‘সুরক্ষাজনিত উদ্বেগের’ কারণে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিনের ট্রায়াল স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আশা জাগানো এবং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের মাঝে ছিল এটি। আমরা এমন সময়ে জানতে পারলাম, যখন ভ্যাকসিনের বিকাশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। 

অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী প্যাসকেল সোরিট এ ব্যাপারে জানান, ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী এক ব্যক্তির মারাত্মক নিউরোলজিক্যাল উপসর্গ দেখা গেছে। মূলত এ কারণেই ট্রায়াল স্থগিত করা হয়েছিল।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি মন্তব্যগুলো জনসম্মুখে করেননি। এর পরিবর্তে অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রধান নির্বাহী কথা বলেছেন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জে পি মরগানের আয়োজিত নিজস্ব সভায়। ভ্যাকসিনের সুরক্ষা তথ্য নিয়ে লুকোচুরি করায় বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থগিতের পর শনিবার অ্যাস্ট্রাজেনেকা বলেছে, তদন্তকারী দল আবারো ট্রায়াল শুরু করার ছাড়পত্র দিয়েছে। কিন্তু কোম্পানিটি এখনো রোগীর শারীরিক অবস্থার কোনো ধরনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। এমনকি বিনিয়োগকারীদের কাছে করা মন্তব্যের কোনো প্রতিলিপিও তারা প্রকাশ করেনি। 

ভ্যাকসিন প্রতিযোগিতার সামনের সারির আরেকটি দল মার্কিন প্রতিষ্ঠান ফাইজার। একই রকম সংক্ষিপ্ত ঘোষণায় রবিবার কোম্পানিটি হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে অন্তর্ভুক্ত করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানোর প্রস্তাব দিয়েছে। 

কিন্তু তারা পরিকল্পনার অল্পসংখ্যক প্রকা্যে বিবরণে দিয়েছে, যেখানে বৃহত্তর গবেষণায় কীভাবে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নির্ধারণ করা হবে তাও অন্তর্ভুক্ত। ওষুধ কোম্পানিগুলোর জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বিবরণ না দেয়া স্ট্যান্ডার্ড বিষয়। 

কারণ সেখানে মেধাস্বত্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি জড়িত। কিন্তু এ সময়টা নজিরবিহীন। তাই স্বাধীন বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরো উচ্চবাক্য হয়েছেন এ মহামারির মাঝে কোম্পানিগুলোকে আরো বেশি উন্মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমেরিকান করদাতারা আরো জানার অধিকার রাখে, কারণ ফেডারেল সরকার অনুমোদিত ভ্যাকসিনের জন্য বিলিয়ন ডলার খরচ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি বৃহত্তর স্বচ্ছতার বিষয়টি জনগণের মাঝে কমে যাওয়া আস্থা হ্রাসের বিষয়টিও বদলে দিতে পারে। 

এ সময়ে এসেই আবার আমেরিকানদের মাঝে ভয় সৃষ্টি হয়েছে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফেডারেল রেগুলেটরদের চাপ প্রয়োগ করতে পারে কার্যকারিতা প্রমাণের আগে ভ্যাকসিন অনুমোদন দেয়ার জন্য। তথ্যের স্বচ্ছতা এ ভয়কেও অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে।

কার্ডিওলজিস্ট এবং স্বাস্থ্যসেবা গবেষক ড. হারলান ক্রুমহোলজ বলেন, আস্থার ঘাটতি রয়েছে। যতই তারা তথ্য ভাগাভাগি করবে, আমরা ততই ভালো অবস্থায় যেতে পারব।

গত সপ্তাহে অ্যাস্ট্রাজেনেকাসহ নয়টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বিজ্ঞানের সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, তাদের বিবৃতিতে জনগণ ও বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের সঙ্গে গবেষণার আরো গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ ভাগাভাগি করে নেয়ার যে প্রতিশ্রুতি তা অনুপস্থিত ছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের অগ্রসরমাণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোয় যুক্ত তিনটি কোম্পানির একটিও এ পরীক্ষাগুলোর প্রটোকল এবং বিশ্লেষণ পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি। একটি বিস্তারিত বিবরণ স্বাধীন বিজ্ঞানীর এ ট্রায়ালগুলো কীভাবে ডিজাইন করা হয়েছে সে সম্পর্কে আরো ভালো ধারণা দিতে পারে এবং সেক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুত হলে জবাবদিহিতার সুযোগও থাকছে। 

আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রায়ালগুলো কীভাবে সেট করা হয়েছে সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ, যেমন কোন পর্যায়ে একটি স্বাধীন বোর্ড প্রাথমিক ফলাফল নিয়ে পর্যালোচনা করতে পারে কিংবা কোন পরিস্থিতিতে একটি ট্রায়াল তাড়াতাড়ি থামিয়ে দেয়া হয়, তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।

মলিকিউলার মেডিসিনের প্রফেসর ড. এরিক টোপোল বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিকাল ট্রায়াল কিংবা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সিরিজ সাম্প্রতিক ইতিহাসে কখনো করা হয়নি। তাই সবকিছু এখানে স্বচ্ছতার সঙ্গে হওয়া খুব জরুরি।

মানুষকে ভ্যাকসিন নেয়ার ব্যাপারে প্ররোচিত করার জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনুসন্ধান এবং ফেডারেল রেগুলেটরদের কঠোরতার বিষয়ে জনগণের আস্থা থাকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

ভ্যাকসিন গবেষণায় জড়িত কোম্পানিগুলো ব্যাপারে সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, সন্দেহবাতিক লোকের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ আমেরিকান উদ্বিগ্ন যে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তাড়াহুড়ো করছে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের সুরক্ষা ও কার্যকারিতার প্রমাণ ছাড়াই অনুমোদন দেয়ার জন্য এবং এটা তারা করছে ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপে পড়ে।

এদিকে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো ভ্যাকসিন গবেষণার ওপর নির্ভর করছে তাদের সুনাম পুনর্নির্মাণ করার জন্য, যা মূলত ওষুধের দাম বাড়ানোসহ নানা কারণে কলুষিত হয়েছে।

জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় এফডিএর সিনিয়র রেগুলেটররা বেশ অস্বাভাবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি গণমাধ্যমের কলামে চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিনের মূল্যায়ন সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছে।

তিনটি বৃহৎ ভ্যাকসিন প্রার্থী মডার্না, ফাইজার ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা যারা যুক্তরাষ্ট্রে অগ্রসরমাণ ট্রায়ালে আছে বলেছে, তারা ট্রায়ালের সম্পর্কে অনেক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।

ফাইজার একটি বিবৃতিতে বলেছে যে ভাইরাসের অভিনবত্ব এবং করোনা ভাইরাস সংকটের দ্রুত পরিবর্তনশীল অবস্থার অর্থ হচ্ছে প্রটোকলকে নমনীয় হতে হবে আমাদের সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের সুরক্ষা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে মূল্যায়নকে বাড়াতে সক্ষম হওয়ার জন্য। 

সংস্থাটি বলছে, তারা ট্রায়াল থেকে সম্পূর্ণ প্রটোকল প্রকাশ করবে মেডিকেল জার্নালে জমা দেয়ার অংশ হিসেবে। যেখানে ফলাফল, তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া এবং পূর্ণ অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এদিকে শনিবার ফাইজার বলেছে, তারা এফডিএর কাছ থেকে অনুমতি চেয়েছে এর ট্রায়ালকে ৪৪ হাজার অংশগ্রহণকারীর মাঝে বাড়ানোর জন্য। যা শুরুতে ছিল ৩০ হাজার। কিন্তু এ ঘোষণা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, কোম্পানিটি কীভাবে নিজেদের লক্ষ্য অনুসারে এত বেশি অংশগ্রহণকারী নিয়ে অক্টোবরের শেষের দিকে নিজেদের ফল জানাতে সক্ষম হবে। 

ফাইজারের একজন মুখপাত্র অ্যামি রোজ বলেন, আমরা কোনো অন্তর্বর্তীকালীন বিশ্লেষণের ব্যাপারে সময়ের উল্লেখ করতে যাচ্ছি না।

অ্যাস্ট্রাজেনেকা শুরুতে অংশগ্রহণকারীর অসুস্থতার কারণের বিশ্বব্যাপী ক্লিনিকাল ট্রায়াল স্থগিত করার বিষয়টি জানায়নি। গবেষণাটি থেমে গিয়েছিল গত রবিবার। কিন্তু মঙ্গলবার স্ট্যাটে নিউজটি আসার আগ পর্যন্ত তারা নিজেরা কিছু জানায়নি। কোম্পানিটি এখনো রোগীর অসুস্থতার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেনি, যা কিনা তাদের ট্রায়াল থামিয়ে দিতে বাধ্য করেছিল।

কোম্পানিটি বলেছে, সোরিয়েটের জে পি মরগানের মিটিংয়ে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ ছিল এবং এখানে বৃহত্ভাবে কোম্পানির ব্যবসায়িক দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যেখানে ট্রায়াল নিয়ে অল্প কিছু প্রশ্ন ছিল। এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট করেছে যে রোগীর দেহে মেরুদণ্ডের প্রদাহের মতো লক্ষণগুলো প্রকাশ পেয়েছিল।

সব মিলিয়ে কোম্পানিগুলোর গোপনীয়তা ও অস্বচ্ছতা মানুষের মাঝে নানা ধরনের উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। ভ্যাকসিনবিরোধী আন্দোলনকারী এবং ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকরা এর সুযোগ নিয়ে মরিয়া হয়ে আছে। তাই তথ্য প্রকাশ ও ট্রায়ালের বিস্তারিত প্রকাশে আরো বেশি স্বচ্ছতাই পারে সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। নয়তো এ অস্বচ্ছতার কারণে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরো অনেক বেশি ঘোলাটে হয়ে উঠতে পারে। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

ব্রেকিংনিউজ/এম

bnbd-ads
breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি