রাজাকারের তালিকা অর্থহীন, আগে উচিত ৩০ লাখ শহীদের তালিকা করা

এস এম আতিক হাসান
২০ ডিসেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
প্রকাশিত: ১০:৫৪ আপডেট: ০২:৫৮

breakingnews

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত চিকিৎসক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নামক স্বাস্থ্যবিষয়ক এনজিও’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করা জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান ১৯৮২ সালে প্রবর্তিত বাংলাদেশের ‘জাতীয় ঔষধ নীতি’ ঘোষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। 

বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস-এ এফআরসিএস পড়াকালীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে লন্ডন থেকে ভারতে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার নিমিত্তে আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন এবং এরপরে ডা. এম এ মবিনের সাথে মিলে সেখানেই ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট “বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল” প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি সেই স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক নারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য জ্ঞান দান করেন, যা দিয়ে তারা রোগীদের সেবা করতেন এবং তার এই অভূতপূর্ব সেবাপদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার “ল্যানসেট”-এ প্রকাশিত হয়।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ফিলিপাইন থেকে রেমন ‘ম্যাগসাইসাই’ (১৯৮৫) এবং সুইডেন থেকে বিকল্প নোবেল হিসেবে পরিচিত ‘রাইট লাভলিহুড’ (১৯৯২), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো’ (২০০২) এবং মানবতার সেবার জন্য কানাডা থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। 

সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে দেশের জনপ্রিয় অনলাইন গণমাধ্যম ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর মুখোমুখি হন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। দীর্ঘ সময়ের কথোপকথনে উঠে আসে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ব্রেকিংনিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট এস এম আতিক হাসান

ব্রেকিংনিউজ : দেশের চলমান রাজনৈতিক অবস্থা কিভাবে মূল্যায়ন করছেন? 

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী : দেশে এক অসহনীয় সংকেত দেখা যাচ্ছে। দেশের মূল ভিত্তি হল কৃষক শ্রমিক। আরেকটি অংশ হল যারা বিদেশে কাজ করে। তাদের প্রেরিত অর্থেই আমাদের জীবন-জীবিকা। মালয়েশিয়া থেকে ৫০ হাজার শ্রমিক ফিরে আসছে। সৌদি আরব থেকে ফিরে আসছে, কাতারসহ অন্যান্য দেশে যেতে দিচ্ছে না। সৌদি আরবে প্রবাসী শ্রমজীবী মেয়েদের ওপরে অত্যাচার হচ্ছে। আজকে ৪০ হাজার কয়েদি কারাগারে থাকার কথা, সেখানে ৯০ হাজার কয়েদিকে জেলে ভরে রাখা হয়েছে। এদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক কর্মী। সর্ব বিশ্লেষণে আমরা একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছি।

ব্রেকিংনিউজ : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কেন জামিন হচ্ছে না, জামিন না হওয়ার পেছনে বিশেষ কী কারণ আছে বলে আপনি মনে করেন? 

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : এখন দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীন নয়। বিচারকদের মেরুদণ্ড শক্ত থাকে না, সে ক্ষেত্রে বিচারকরা মুক্তচিন্তা করতে পারেন না। ফলে তাদের কাছে খালেদা জিয়ার জামিন প্রত্যাশা করা ভুল। একটি অসম্পূর্ণ মেডিকেল রিপোর্টের অজুহাত দিয়ে সর্বোচ্চ আদালত জামিন বাতিল করেছে। এটা থেকেই প্রমাণিত- তাদের (বিচারক) বিবেক নাই, সাহস নাই। মোট কথা, দেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নেই বলেই খালেদা জিয়া জামিন পাচ্ছেন না।

ব্রেকিংনিউজ : কোন প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার জামিন হতে পারে। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য নেতাকর্মীদের করণীয় কী?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : বিএনপির নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তি চায় কিনা সেটাও অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই মামলাটায় (জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট) জামিন হলেও তাঁর মুক্তি হতো না, আরেকটি মামলা রয়ে গেছে। দুটি মামলাকে একত্রে তারা কেন উপস্থাপন করছেন না তাও জানি না। বিচারকরা যাতে সাহস পান তার জন্য উচিত ছিলো হাইকোর্টে এবং চারদিকে দশ হাজার কর্মীকে চুপচাপ দাঁড় করিয়ে রাখা। বিএনপির ১ লাখ নেতাকর্মী জামিনে আছে, আরও ৭ লাখের নামে মামলা আছে। তাদের সবাইকে নিয়ে হাইকোর্টে ন্যায়বিচারের জন্য হাজির করাতে পারতো। স্থায়ী কমিটির যারা আছে তাদের এতো ভয় কেন? আন্দোলন ছাড়া, রাজপথে যাওয়া ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি অসম্ভব ব্যাপার। 

ব্রেকিংনিউজ : বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি কি সঠিক পথে রয়েছে? 

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : বিএনপি মোটেই সঠিক পথে নেই। তারা ঘুমিয়ে আছে। 

ব্রেকিংনিউজ : তাহলে বিএনপির এখন কী করা উচিত? 

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : প্রথম কাজ হলো- তারেক জিয়ার দুই বছর পড়াশুনা করা উচিত। এখানে স্কাইপে সময় ব্যয় না করে, কোনও অজুহাত সৃষ্টির সুযোগ না দিয়ে তার পড়াশুনা করা উচিত। তার মেয়েটার যেহেতু পড়াশুনা শেষ হয়ে গেছে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া উচিত। দেশে এসে বিএনপির নেতা হিসেবে নয়, একজন কর্মী হিসেবে কাজ করা উচিত। স্ট্যান্ডিং কমিটির সকলের পদত্যাগ করে দেয়া উচিত। তাদের জরুরি কাউন্সিল করে অস্থায়ী নেতৃত্ব আনা উচিত, যতদিন না খালেদা জিয়ার জামিন হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তির পরে বড় কাউন্সিল করে তাদের নেতৃত্ব স্থির করা উচিত। 

ব্রেকিংনিউজ : রাজাকারের তালিকা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ আছে, তালিকায় আসল রাজাকারদের নাম যেমন আসেনি, আবার রাজাকারের মুক্তিযোদ্ধাদের নামও এসেছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এ বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখছেন?  

ডা. জাফরুল্লাহ : রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করার পূর্বে যে ত্রিশ লাখ লোক মারা গেছে তাদের তালিকা প্রকাশ করা উচিত। তারপরে রাজাকারের তালিকা করা উচিত। রাজাকাররা আনসারের মত বেতনভোগী কর্মচারী ছিল। আমার বাবা রাজাকার ছিল বলে তাকে নতুনভাবে শাস্তি দেয়া ঠিক কাজ নয়। যেখানে এখনও আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করতে পারিনি, সেখানে রাজাকারের তালিকায় ভুল-ভ্রান্তিতো হবেই। সরকার গতি হারিয়েছে, তাই তারা একবার এটা করে, আরেকবার ওটা করে। একবার শুদ্ধি আন্দোলন করে, আরেকবার ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান করে। 

এতোদিন পরে রাজাকারদের তালিকা করার কোনও অর্থই হয় না। চিন্তা করা উচিত, যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছে আমরা তাদের তালিকা কেন করছি না। প্রথম কাজ হচ্ছে, একাত্তরে কোন গ্রামে কত জন মারা গেছে সেই তালিকা করা। আর রাজাকারের তালিকা যদি করতেই হয়, সেটার জন্য ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, অনেক সময় গ্রামবাসী নিজেরাও স্থির করে দিয়েছে কে রাজাকার কে মুক্তিযোদ্ধা। সকল লোক চলে গেলে গ্রামবাসীদের সহোযোগিতা করবে কে, সেজন্য দু-চারজন থেকে গিয়েছিল, তারা পাকিস্তানিদের সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধাদেরও সহযোগিতা করেছে। এদের তো অস্বীকার করা যাবে না। যুদ্ধ চলাকালে আমি আগরতলা থেকে একটি কাজে ঢাকায় আসার পথে রাত্রিবেলায় যে বাড়িতে ছিলাম সেটাতো শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের বাড়ি, সেই বাড়িতে তো পাকিস্তানি ফ্ল্যাগ উড়ছিল। আগরতলা থেকে যে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় আসতো অধিকাংশই সেই বাড়িতে আশ্রয় নিতো। সেই শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সেকি রাজাকার? সেকি মানবতাবিরোধী? একটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তালিকা প্রকাশ করা ভুল কাজ, এটা নিয়ে জাতিকে বিভক্ত করা উচিত নয়। 

ব্রেকিংনিউজ : ভারতের এনআরসি তালিকায় যারা বাদ পড়েছে বলা হচ্ছে তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশের এবং তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের কী ভূমিকা নেয়া উচিত? 

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : এটা নিয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ও বিভিন্ন শহরে তুমুল আন্দোলন চলছে, আগুন জলছে। এটা অন্যায়, ধর্মান্ধতার কাজ। অথচ বাংলাদেশ সরকারই সেই নরেন্দ্র মোদীকে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীতে প্রধান অতিথি রাখছে। বঙ্গবন্ধু অন্ততপক্ষে একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর অন্যান্য সমালোচনা করা যাবে, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান যে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন এ সম্পর্কে কারও দ্বিমত নেই। অথচ তাঁর জন্মের শতবার্ষিকীতে একজন ধর্মান্ধ ব্যক্তিকে প্রধান বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ করে আনা হচ্ছে, এটা লজ্জাজনক, এটা দুর্ভাগ্যজনক।

আজকে এই এনআরসি বাংলাদেশের জন্য ভয়ানক। অথচ বাংলাদেশ সরকার বলছে, এটা ভারতের অভ্যন্তরীন, কিন্তু এটা শুধুমাত্র ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার নয়। যারা দ্বারা আমরা অ্যাফেকটেড হই, আজকে সে বিষয়ে পরিষ্কারভাবে বক্তব্য রাখা দরকার, আমাদের আরও সজাগ থাকা দরকার। ইতোমধ্যে আমাদের প্রতিটি বর্ডার দিয়ে ভারতীয়রা অনুপ্রবেশ করছে। বাংলাদেশের জন্য এটা একটা ভয়ানক বিপদের সংকেত। এটা নিয়ে আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারি না। আজকে আমাদের উচিত হবে, ইলফসকে ট্রেনিং দেয়া, কাশ্মিরকে সমর্থন করা, মাওবাদীদের সমর্থন করা। ভারতের জনগণের সকল আন্দোলনকে সাহায্য সহযোগিতা করা আমাদের সময়ের দাবি।

ব্রেকিংনিউজ : সময় দিয়ে কথা বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
 
ডা. জাফরুল্লাহ : আপনাকে ও ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি পরিবারকেও ধন্যবাদ।

ব্রেকিংনিউজ/এএইচ/এমআর

bnbd-ads
breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি