রায়ে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া জয়নুলের, আপিলে যাওযার কথা বললেন মওদুদ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৮:২৬ আপডেট: ১০:০১

রায়ে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া জয়নুলের, আপিলে যাওযার কথা বললেন মওদুদ

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি ও অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার করা জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। খালেদা জিয়ার জামিন খারিজের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেছেন আমরা ক্ষুব্দ। আমরা বসে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করব, আর মওদুুদ আহমদ বললেন এ আদেশে আমরা ক্ষুব্দ, আমরা উচ্চতর আদালতে যাব।

বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টার পর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হক সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট এ আদেশ দেন।  

আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এ জে মোহাম্মদ আলী, নিতাই রায় চৌধুরী, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সগীর হোসেন নিওন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আর দুদকের পক্ষে ছিলেন খুরশিদ আলম খান।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিতভাবে মামলায় খালেদা জিয়াকে ২ বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে রাখা হয়েছে। একটি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় বেআইনিভাবে খালেদা জিয়াকে জেলে পুরে রাখা হয়েছে। তাকে জেলে আটকে রাখার কারণ হলো ষঢ়যন্ত্র।  সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে ভয় পায় এবং সে কারণে কোনো অবস্থাতেই খালেদা জিয়া যাতে আইনি লড়াইয়ে মুক্তি পাক, সরকার এটা চায় না।'

তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই শ্রদ্ধাশীলতার কারণে তিনি বলেছেন- আইনি লড়াইয়ে আমার জামিন পাওয়ার অধিকার আছে। এটা আমার সাংবিধানিক অধিকার। এর পূর্বে জামিন আবেদন নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গিয়েছিলাম কিন্তু জামিন পায়নি। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) থেকে যে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছিল। তা ছিল অসম্পূর্ণ। এই অসম্পূর্ণ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ আদালত একটি জাজমেন্ট দিয়েছিল। তারপর ওনার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। তিনি এখন জীবন-মরণের সম্মুখীন আছেন। আমরা ৪২৬ (১) অনুযায়ী আমরা তার জামিন আবেদন করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিএসএমএমইউ হাসপাতাল সরকারের কন্ট্রোলে এবং নিয়ন্ত্রিত একটি হাসপাতাল। এই হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট কোনোদিন পাওয়া সম্ভব না। যতবারিই আমরা রিপোর্ট চাই, ততবারই মনে হচ্ছে এমনভাবে রিপোর্ট লেখা হয় যাতে করে আদালত সেটাকে অন্য দৃষ্টিকোন থেকে সেটা দেখে। যাতে মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে না পারে। সেভাবেই তারা প্রতিবার রিপোর্ট দেয়।’

খালেদা জিয়ার আইনজীবী বলেন, ‘আমরা বলেছি- তার (খালেদা জিয়া) জীবন অত্যন্ত ঝূকিপূর্ণ। এই ঝঁকিপূর্ণতার কারণে বেগম খালেদা জিয়া সঠিক চিকিৎসা নিতে পারছেন না। তাই আমরা বলেছি- বেগম জিয়ার যেখানে অপারেশন হয়েছে সেখানে তাঁর চিকিৎসা নেয়া দরকার। আদালত আমাদের ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য শুনেছেন। সেখানে আমাদের জামিন আবেদন খারিজ করেছেন। আদালত দুটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।’

জয়নুল বলেন, ‘আমরা মনে করি দেশের সর্বোচ্চ আদালত আমাদের জামিন আবেদন বিবেচনায় নেয়া উচিত ছিল। এজন্য আমরা ক্ষুব্দ। আমরা পরবর্তীকে বসব। আমাদের আইনজীবীরা বসে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

উচ্চতর আদালতে যাওয়ার ঘোসণা দিয়ে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমরা আবার উচ্চতর আদালতে যাব, আমরা প্যারোলের কথা চিন্তা করছি না। আমরা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করব, একই সঙ্গে আন্দোলনও চালিয়ে যাব।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষের উচিত হবে- আমাদের জেল কোড অনুযায়ী ওনি (খালেদা জিয়া) যে চিকিৎসকের কাছে, যেভাবে ওনার চিকিৎসা করাতে চান সেভাবে করানো। বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারটি নির্ভর করে ওনার চিকিৎসা যদি এখানে না হয়, তাহলে বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। যেটা আমরা আমাদের আবেদনে বলেছি।’ 

দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার জামিন সংক্রান্ত বিষয়ে আজকে (২৭ ফেব্রুয়ারি) আদেশের জন্য দিন ধার্য ছিল। সকালে যখন মামলাটি শুনানি হয়, তখন আদালত শুনেছে। তখন আদালত আদেশ দিতে চেয়েছিলেন পরবর্তীকে বেগম জিয়ার আইনজীবীর আবেদনের ভিত্তিতে আদেশের সময় ২টায় স্থানান্তর করা হয়। দুপুর ২টায় ওনার (খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা) একটি সাপ্লিমেন্টারি এফিডেভিট নিয়ে আসে। সেখানে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বর্ণনা করা হয়।’

খুরশিদ আলম বলেন, ‘আদালতে আমরা বলেছি- গত বছরের ৩১ জুলাই একই মেরিটে খারিজ করেছেন। তখনো স্বাস্থ্য বিষয়ক এবং ওনার বয়স বিষেয়ে আর্গুমেন্ট হয়েছিল। এগুলো বিবেচনা করেছেন। আজকে যে দরখাস্ত সেটা নতুন করে একইভাবে এসেছে। তারপরে এই হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে তারা আপিল বিভাগে গিয়েছেন। আপিল বিভাগে মেরিটে আলোচনা করেছেন। এ অবস্থায় আপনি যেহেতু সদয় তাদের আবেদন নিয়েছেন। আপিল বিভাগের গাইড লাইনের আলোকে আপনারা একটি মেডিকেল রিপোর্ট চেয়েছেন। এবং সেখানে তিনটি প্রশ্নের ব্যাখ্যা চেয়েছেন মেডিকেল বোর্ডের কাছে। বেগম খালেদা জিয়া সম্মতি দিয়েছে কিনা, সম্মতি দিয়ে থাকলে আপনারা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন। সর্বশেষ বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থানটা কী? সর্বশেষ যে রিপোর্ট এসেছে সেখানে খালেদা জিয়া সম্মতি দেননি। কাজেই সম্মতি না দিয়ে থাকলে তাহলে ওনার স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা করা সম্ভব না। আর তৃতীয় প্রশ্ন হলো ওনারা বলেছেন এটা আমরা পর্যবক্ষেণে রেখেছেন। আদালত দুটো পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।’

সেগুলো হলো:
১. খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত বন্দী আসামি। বিচারাধীন আসামি ও সাজাপ্রাপ্ত আসামি, তাদের দুজনের মধ্যে তফাত আছে। কাজেই কারাবন্দী আসামি হিসেবে ওনার বেলায় জেল কোড প্রযোজ্য হবে।

২. যদি কখনও চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়া সম্মতি দেন মেডিকেল বোর্ড যেন তাৎক্ষণিক ওনার সম্মতি সাপেক্ষে যা যা করা দরকার তা যেন করে। এ ক্ষেত্রে যদি মেডিকেল বোর্ডে আরও সদস্য সংযুক্ত করা প্রয়োজন মনে করে যেন তারা সেটি করে।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি (রবিবার) অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের (উন্নত চিকিৎসা) জন্য খালেদা জিয়া সম্মতি দিয়েছেন কিনা, সম্মতি দিলে চিকিৎসা শুরু হয়েছে কিনা এবং শুরু হলে বর্তমানে তার কী অবস্থা তা জানাতে বিএসএমএমইউ’র উপাচার্যকে বুধবারের (২৬ ফেব্রুয়ারি) মধ্যে জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। 

ওই আদেশ অনুসারে বুধবার বিএসএমএমইউ থেকে সুপ্রিম কোর্টে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) আবেদনটি উপস্থাপনের পর আদালত ২৩ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছিলেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) এই আবেদনটি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় দায়ের করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী সগীর হোসেন লিয়ন।

এর আগে, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর এ মামলায় তার জামিন আবেদন পর্যবেক্ষণসহ খারিজ করে দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। তবে আবেদনকারী (খালেদা জিয়া) যদি সম্মতি দেন, তাহলে বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী তার অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের পদক্ষেপ নিতে বলা হয়।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। পরে তিনি আপিল করলে হাইকোর্টে দণ্ডের মেয়াদ বেড়ে ১০ বছর হয়। পরে ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর খালাস চেয়ে আপিল বিভাগে খালেদা জিয়া জামিন আবেদন করেন। তবে সেই আবেদন এখনো আদালতে উপস্থাপন করেননি তার আইনজীবীরা।

২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের সাত নম্বর কক্ষে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক মো. আখতারুজ্জামান (বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি) জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সাজা হয়েছে মামলার অন্য তিন আসামিরও।

দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য তিন আসামিরা হলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, তার তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

এরপর ওই বছরের ১৮ নভেম্বর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এর বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। পরে গত বছরের ৩০ এপ্রিল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাত বছরের দণ্ডের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অর্থদণ্ড স্থগিত ও সম্পত্তি জব্দ করার ওপর স্থিতাবস্থা দিয়ে দুই মাসের মধ্যে ওই মামলার নথি তলব করেছিলেন।

এরপর গত ২০ জুন বিচারিক আদালত থেকে মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পরে ৩১ জুলাই বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এসএম কুদ্দুস জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ তার জামিন আবেদন খারিজ করে দেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে জামিন চান খালেদা জিয়া। এ আবেদনের শুনানির পর ১২ ডিসেম্বর সেটি খারিজ হয়ে যায়।

২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা করা হয়। ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে মামলাটি করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তদন্ত শেষে ২০১২ সালে খালেদা জিয়াসহ চার জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয় দুদক। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হলে দুদকের পক্ষে এই মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণা করা হয়।

ব্রেকিংনিউজ/ কেআই/ এসএ 

bnbd-ads
breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি