প্রাথমিক শিক্ষা ও সমকালীন ভাবনা

আরফিন আখতার ছিদ্দিকা
১ জানুয়ারি ২০২০, বুধবার
প্রকাশিত: ০৪:১৮ আপডেট: ০৪:১৮

প্রাথমিক শিক্ষা ও সমকালীন ভাবনা

একদল শিশুকে যদি ফুল আঁকতে বলা হয়, তখন সবশিশুই যে অবিকল একই ফুল আঁকবে না এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। বরং প্রত্যেকের আঁকা ছবিই আলাদা হবে। রঙের পার্থক্য, আকারের পার্থক্য এমন কি ফুলের পাপড়ির সংখ্যাতে ও পার্থক্য পাওয়া যাবে। কেউ আঁকবে ফুটন্তলাল গোলাপ, কেউবা আঁকবে ছোট্ট কুড়িসহ জলেভাসা শাপলা। এরপর সবার আঁকা ফুলগুলোকে যদি এক জায়গায় করা হয়, আমরা দেখতে পাবো একটি রঙিন বাগান। যে বাগানে সবধনের ফুলই ফুটেছে। একেকজন একেকটি ফুল আঁকার ফলে প্রতিটা শিশুই কিন্তু কয়েকটি করে নতুন ফুলের নাম শিখবে, ফুলগুলোর বৈশিষ্ট্য জানবে।

এবার ভাবুনতো, শিশুগুলোকে আবারো ফুল আঁকতে দেওয়া হলো। কিন্তু তাদের বলে দেওয়া হলো, দুইটি সবুজপাতা, একটি কুড়ি আর সাত/আটটি কাটাসহ একটি লাল রঙের গোলাপ ফুল আঁকতে। এরপর সকলের আঁকা ছবি দেখতে কেমন হবে? মোটেও খারাপ হবে না। বরং সবগুলো ছবিকে একত্র করলে একটি গোলাপের বাগান মনে হবে। যেখানে কারো গোলাপ খুব সুন্দর, কারো গোলাপটি হয়তো একটু চুপষে গেছে। আবার কারো গোলাপ হয়তো দেখতে গোলাপের মতই হয়নি। ঠিক তখনই আমরা তুলনা করা শুরু করবো। কেউ খুব সুন্দর ছবি আঁকার জন্য বাহবা পাবে, কেউ আবার একটু কম সুন্দর আঁকার জন্য কোনই প্রশংসা পাবে না। এক্ষেত্রে শিশুরা শুধু ওই গোলাপ ফুলটিকেই ভালমত চিনলো, পৃথিবীতে আরো কত রকমের, কত রঙের ফুল আছে, এই সম্পর্কে তাদের ধারণা হলো না। যদিও একটি বিষয়কে পরিপূর্ণভাবে জানার জন্য শুধু ওই বিষয়েই জোর দেওয়া ভাল, কিন্তু তার জন্য সঠিক বয়স নিশ্চয়ই ছয় থেকে দশ বছর নয়। বরং এই বয়সী শিশুদের সামনে পুরো পৃথিবীকে উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত, যাতে তারা তাদের আগ্রহের জায়গাটা খুঁজে পায়।

আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি হবে ঠিক প্রথম অংশের ছবি আঁকারমত। আমরা শিশুদের স্বাধীনভাবে শেখার সুযোগ করে দিব। এতে করে তাদের মধ্যে তৈরি হবে আত্মবিশ্বাস, সৃষ্টিশীলতা ও জানার আগ্রহ। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও খুব দ্রুত হয়, যা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের হবে না। তাই এই নরম মস্তিষ্ককে সঠিক ছাঁচে ফেলতে পারলেই একটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় বলে আমি মনে করি। জরুরি নয় যে মস্তিষ্ক নিতে পারে বলেই আমরা জোর করে যত পারি ততজ্ঞান একটি শিশুর মাথায় ঢুকিয়ে দিব। শুধুই পাঠ্য বইয়ের শিক্ষা নয়, বরং শেখার আগ্রহকে জাগিয়ে তোলাই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ হোক। ব্যক্তিগতভাবে আমি দলগত শিক্ষায় বিশ্বাসী। এতে করে শিশুরা তাদের ভাবনার আদান প্রদান করতে পারে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন প্রকার প্রতিযোগিতা থাকুক তা আমি চাই না। প্রতিযোগিতার চাপে একটি শিশু ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাকে বাকে’ অথবা ‘আমি হব সকাল বেলার পাখি’ মুখস্ত করে ফেলে ঠিকই, কিন্তু চোখের সামনে এঁকে বেঁকে চলা নদী অথবা ভোর বেলায় ফুলের বাগানে হেঁটে বেড়ানোর মত চমৎকার অভিজ্ঞতা হয় না অনেকেরই।

প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই হোল একেকটা ফুলের বাগান। যেখানে শুধুই এক ধরনের নয়, বরং সবধরনের ফুলের অর্থাৎ শিশুর সমাহার হয়। যেখানে সব ফুলকেই সমান আদর-যত্মে লালন করা হয়, কোনটিকেই জোর করে গোলাপ বানানোর চেষ্টা করা হয় না। বরং প্রতিটি শিশুকে তার নিজ নিজ জায়গা থেকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। প্রাথমিক শিক্ষার এক অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিশুদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। একটি শিশু সেই বিষয়েই আগ্রহ খুঁজে পায়, যেখানে সে অবাধে বিচরণ করতে পারবে এবং আনন্দ পাবে। শিশুর কল্পনা-শক্তি, সৃজনশীলতা ও নান্দনিক বোধের উন্মেষে সহায়তা করার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিকল্প নেই। অনেকেই হাজারো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিরে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে অবহেলা চোখে দেখে থাকেন। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষকই এক বছরের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর শিক্ষকতা শুরু করেন। অর্থাৎ, আমাদের শিক্ষকরা সুশিক্ষিত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং উপযুক্ত। 
অনেকেরই ধারণা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলে মেয়েদের যা শেখানো হয়, তার থেকে ঢের বেশি শেখানো হয় বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন গুলোতে। কিন্তু আপনি কি জানেন আপনার সন্তানের বয়স অনুযায়ী তার ঠিক কতটুকু শিক্ষা প্রয়োজন? এই উত্তর জানি আমরা। একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থায় সবার আগে প্রাধান্য দেওয়া হয় একটি শিশুর জন্য কতটুকু শিক্ষা যথেষ্ট সেই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কতৃক নির্ধারিত প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যে সকল বই আছে, সেগুলো কোন অংশেই অপরিপূর্ণ নয়। এটি পরীক্ষিত যে, একটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত বইগুলোই আদর্শ এবং যথাযথ।

বিদ্যালয় হবে শিশুদের আনন্দের জায়গা। যদি এই বিদ্যালয়ের নাম শুনলেই শিশুরা ভয়ে কুঁকড়ে যায়, তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। শিশুদের বিজ্ঞান মনস্ক ও অনুসন্ধিৎসু করে গড়ে তুলতে সহায়তা করা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দায়িত্ব। এছাড়াও গাণিতিক ধারণা, যৌক্তিক চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জনে তাদের সহায়তা করাও আমাদের কাজ।

আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও সুনাগরিক হওয়ার গুণাবলী এবং বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে সহায়তা করি। ভালো-মন্দের পার্থক্য অনুধাবনের মাধ্যমে সঠিক পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করি। অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া, পরমত সহিষ্ণুতা, ত্যাগের মনোভাব ও মিলে মিশে বাস করার মানসিকতা সৃষ্টিতে সাহায্য করি। নিজের কাজ নিজে করার মাধ্যমে শ্রমের মর্যাদা উপলব্ধি ও আত্মমর্যাদা বিকাশে সহায়তা করি। প্রকৃতি, পরিবেশ ও বিশ্ব জগৎ সম্পর্কে জানতে ও ভালবাসতে সহায়তা করি এবং পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্ভুদ্ধ করি। নিরাপদ ও স্বাস্থ্য সম্মত জীবন যাপনে সচেষ্ট করি। জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ভালোবাসতে সাহায্য করি। এরপরে ও কি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অসম্পূর্ণ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অযোগ্য বলা হবে?

কিছু তথ্য
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চার ধরনের শিক্ষা পাঠদান চলছে। তা হলো- সরকারি বিদ্যালয়, পরীক্ষণ বিদ্যালয় যা পিটিআই এর সাথে সংযুক্ত, নিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কমিউনিটি বিদ্যালয়। উল্লেখিত বিদ্যালয় বাদ দিয়ে অনিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন এবং কিছু এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে এবতেদায়ী মাদরাসা এবং মাধ্যমিক মাদরাসা সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদরাসা যা প্রাথমিক শিক্ষার সমমানের। অর্থাৎ, বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ প্রকারের প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে যার সংখ্যা প্রায় ৮০, ৪০১টি যেখানে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু লেখা পড়া করছে এবং শিক্ষক সংখ্যা প্রায় সোয়া তিন লাখ।

ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুসারে এখনো সাড়ে চল্লিশ লাখ শিশুর কাছে প্রাথমিক শিক্ষা পৌঁছাতে পারছে না। অধিকন্তু, রিপোর্টটি উত্থাপন করে যে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে যার মূল কারণ হলো দক্ষ শিক্ষকের অভাব, দুর্বলভিত্তি, অনিয়মিত শিক্ষার্থী, অপুষ্টি এবং খাদ্য নিরাপত্তা। অনেক বিদ্যালয়ে কম আয়তনের শ্রেণি কক্ষে ধারণ ক্ষমতার বেশি শিক্ষার্থী পাঠদান নিচ্ছে। নিম্নআয়ের পরিবার থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝড়ে পড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। যথাযথ পানি এবং শৌচাগার সুবিধা ও অনেক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। অনেক সময় আবার ধর্মীয় অনুশাসন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

এ থেকে উত্তরণের জন্য, সরকারকে কঠোর হস্তে গৃহীত নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে। অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালাকে আইনি অনুশাসনের মধ্যে আনতে হবে। এছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণির মধ্যে আবদ্ধনা রেখে তা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বৃদ্ধি করলে শিক্ষার্থীরা লাভবান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লেখক: প্রধান শিক্ষক, নাগেশ্বরী ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম। 

ব্রেকিংনিউজ/এমএইচ

breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি