আইনে শ্রদ্ধাশীল হলেই মিলবে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন

মোহাম্মদ হাসান
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, সোমবার
প্রকাশিত: ০২:৪৬

আইনে শ্রদ্ধাশীল হলেই মিলবে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন

পৃথিবীতে একমাত্র মানুষই নিজেদের প্রয়োজনে আইন তৈরি করে এবং মেনে চলে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ তার জনগণের নিরাপত্তা ও উন্নত জীবন যাপনের জন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে। যে দেশের জনগণ আইনের প্রতি বেশি শ্রদ্ধাশীল, সে দেশ ততবেশি উন্নত ও নিরাপদ। উন্নত বিশ্বের জনগণ আইনের প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল।এ সব দেশে ধনী গরিব ও ক্ষমতাধর নির্বিশেষে সকলের প্রতি আইনের সমান প্রয়োগ হয়। সেই জন্য সারা বিশ্বের জনগণ এসব দেশকে অধিক নিরাপদ মনে করে। আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা দেখা যায়।

যেমন যেখানেই অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা, সেখানেই জীবনের শঙ্কা; সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অগ্নি দুর্ঘটনাগুলোই এর প্রমাণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন থাকলেও তা না মানা বা তদারকি না থাকায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। কমপ্লায়েন্স না মেনে গড়ে ওঠা ছোট ছোট কারখানাগুলো এক সময় নিমতলীর মতো বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

নগর পরিকল্পনাবিদের মতে, আইন থাকলেও তা সীমাবদ্ধ কাগজেই। তাই যে কোনো দুর্ঘটনার গাফিলতির দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও।

নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বের হোসেন বলেন, এসব কারখানার অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়? এসবের বিষয়ে আইন আছে, তাই ‘শাস্তি’ শুরু করতে হলে ঘর থেকে শুরু করতে হবে।

একের পর এক দুর্ঘটনার পরও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে নিরাপত্তাহীনতায় থাকবে প্রতিটি শহর, প্রতিটি মানুষ।

আইন অনুযায়ী কোনো রাস্তায় বা জনগণের চলার জায়গায় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে না। যদি কেউ কোনোভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, তাহলে দায়ী ব্যক্তিকে জেল এবং জরিমানা দুটির একটি অথবা উভয় সাজা ভোগ করতে হবে। ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি অমান্য করা যাবে না এবং অমান্য করে ফুটপাত দিয়ে গাড়ি চালালে ট্রাফিক পুলিশের ক্ষমতা রয়েছে দায়ী চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার। বেপরোয়া যান চালানো যাবে না। নির্দিষ্ট গতিসীমার বাইরে যান চালানো যাবে না। এ ছাড়া মোটরসাইকেলে অতিরিক্ত আরোহী বহন করা যাবে না। কেউ হেলমেট ছাড়া কোনোভাবেই রাস্তায় মোটরসাইকেল নিয়ে বের হতে পারবে না। এসব অপরাধের জন্য সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানাসহ জেলের বিধান রয়েছে। কিন্তু মানছে কে? 

ফুটপাত হাঁটার জায়গা, এখন আর সেটা সম্ভব নয়। ফুটপাত জুড়ে রয়েছে মোটরসাইকেল চালকদের দাপট। নেই হেমলেট। আপনাকে থামিয়ে দিয়ে বাজাচ্ছে উচ্চ শব্দে হর্ন। রাস্তায় এটি এখন সাধারণ দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হয়, ফুটপাত বুঝি মোটরসাইকেল চালানোর জন্যই। এই মোটরসাইকেলের চালকেরা রাস্তায় আইন-কানুনের তোয়াক্কাই করে না। তাদের কথায় যেন আইন চলে, চলে প্রশাসন। আইন আছে, কিন্তু নেই প্রয়োগ। আর একারনেই বেপরোয়া চলছে মোটরসাইকেল। হেমলেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘটছে অহরহ দুর্ঘটনা। বর্তমানে নগরজুড়ে নতুন এক আতঙ্কের নাম বেপরোয়া মোটরবাইক।

বাংলাদেশে শ্রম আইনে বলা আছে, কোনো শ্রমিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবেন না। কোনো শ্রমিক ছয় ঘণ্টার বেশি কাজ করবেন না যদি না তাকে খাবার ও বিশ্রামের জন্য এক ঘণ্টা বিরতি দেওয়া হয়। সপ্তাহে কোনো শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ৬০ ঘণ্টার বেশি হবে না। কলকারখানা ও শিল্প ক্ষেত্রে শ্রমিকরা এক দিন ছুটি পাবেন বলে শ্রম আইনে বলা আছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় এক-চতুর্থাংশ (প্রায় ২৪ শতাংশ) নিরাপত্তা কর্মী দৈনিক ১৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। ৫০ শতাংশ কর্মী কোনো কর্মবিরতি ছাড়া কাজ করেন। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ (প্রায় ৬৬ শতাংশ) নিরাপত্তাকর্মীর সাপ্তাহিক ছুটি নির্ধারিত নেই। সরকারি ছুটির দিনে ৮৬ শতাংশ কর্মী কাজ করেন।

পরিবহন খাত নিয়ে বিলস বলছে, প্রায় ৫০ শতাংশ শ্রমিক দৈনিক ১৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। ২০ শতাংশ পরিবহন শ্রমিক কোনো কর্মবিরতি ছাড়াই কাজ করেন। ৯০ শতাংশের বেশি পরিবহন শ্রমিকের কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই। ৯৮ শতাংশ শ্রমিক সরকারি ছুটির দিনেও কাজ করেন। 

দূরপাল্লার চালকরা যেন ৫ ঘণ্টার বেশি একটানা যেন গাড়ি না চালান, তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তার প্রতিফলন নেই! 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমত ভাইরাল হয়েছে ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’আন্দোলন তবুও মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ঘটেনি। দেশের মানুষ নিজের সুবিধাকে বড় করে দেখেছে, নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছে নাহ, মানছে নাহ সড়ক আইন, আর সুযোগ নিচ্ছে বাস-মালিক-শ্রমিকরা।

ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো, দ্রুত গতি, বেপরোয়া এবং বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র দিয়ে রাস্তা পারাপার, আইন না মানা এই সংস্কৃতি থেকে সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা শাস্তির আওতায় আসা অবধারিত।

আইনের প্রয়োগ যথার্থ হয় খুব কমই। আইনে সুযোগ পেতে মিডলম্যান ধরতে হয়। আদালতে উকিল অন্যক্ষেত্রে ক্ষমতাবান। দু’দিকেই আর্থিক রসদ লাগে। আইন যদি তার নিজের গতিতে চলে তাহলে সুশাসন আসতে বাধ্য। সংবিধানেও আইনের সুশাসনের কথা বলা আছে। সুষম বণ্টনের কথা বলা আছে। সমাজে পিছিয়ে পড়াদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারকে দেওয়া আছে। সরকার বৈষম্য নিরসনে কাজ করছে। বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু সাধারণ নাগরিক বিভিন্ন কারণে শতভাগ সুবিধা নিতে পারছে না!

বৈষম্য নিরসনে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক বেষ্টনীমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু এখানেও বৈষম্য থেকেই যায়। সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি করছে কারা? উচ্চ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই তো! ফলে যোগাযোগ বা অন্ধকারে থাকারা বেশিরভাগই অন্ধকারে থেকে যাচ্ছে। এসব আলোচনা থেকে মনে পড়ে কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের কথা। তার মধ্যের একটি লাইন, ‘ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না...’।

সবচেয়ে বড় সমাধান হচ্ছে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। মানুষ হিসেবে আমাদের লজ্জাতে মাথা লুকাবার প্রেস পাওয়ার কথা নয়। তাই এখনই নেতিবাচক মনোভাব ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন দরকার। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে! আমরা যারা প্রভাব বিস্তার করতে পারি তাদের বেশিরভাগেরই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা মুখে বলি এক আর মনে ধারণ করি অন্যটা। আর বাস্তবায়ন করি তৃতীয়টা।

সৃষ্টিকাল থেকেই সমাজের বিভিন্ন স্তরে বৈষম্য বিদ্যমান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার বৈষম্য দূরীকরণে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা আন্তরিকও। এখন আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সরকারের সাথে একসাথে কাজ করতে হবে। আইন মেনে চলার জন্য সকলকে সচেতন হতে হবে তবেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার আশা পূরণ করা যাবে। ‘মুজিববর্ষ’-তে এটা হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।

লেখক: সংবাদ কর্মী ও কলামিস্ট

breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি