আত্মহত্যা ও একজন সৌমিক মিত্র

আব্দুজ জাহের নিশাদ
৬ এপ্রিল ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ০৪:৪৯ আপডেট: ০৪:৫৪

আত্মহত্যা ও একজন সৌমিক মিত্র

বিধাতার অপার করুণায় এই ভুবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনও কিছুই আজ আমাদের অজানা নয়। সীমাহীন পৃথিবীর প্রেমময়ী রহস্য উদঘাটন করতে  ক্ষণস্থায়ী ধরার কেউবা চিরস্থায়ী হওয়ার জন্য কাল্পনিক প্রচেষ্টাও চালায়। যদিও সবাই স্রষ্টার কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময় নিয়েই এসেছে। তবে ধরার এই সৌন্দর্য  ব্যক্তির জন্য ক্ষণস্থায়ী জানা সত্ত্বেও এই ভুবনে মানুষ চিরস্থায়ী হতে চায়। মাঝে মাঝে কালাশ্রয়ী সমাজের কিছু মানুষ ধরার অফুরন্ত শ্রী-কে তুচ্ছ ভেবে স্বেচ্চায় নরকের আশীর্বাদ পেতে চায়। যে মানুষটা মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও পৃথিবীর নান্দনিক শ্রী-কে চিরস্থায়ী হিসেবে দেখতে চেয়েছে এক মুহূর্ত পরেই সেই মানুষটি জীবনের সকল স্বপ্ন চোরাবালিতে নিপতিত করে পাড়ি জমায় অনন্তের পথে। 

আবার পৃথিবীতে এমন কোনও ভুল নেই যার কোনও সমাধান কিংবা ক্ষমা নেই। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য্য আর সমাধানের চেষ্টা করা। ধৈর্য আর সমাধানের চেষ্টা না করাটাই হচ্ছে কাপুরুষতার পরিচয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর বিশ্বে আট লাখের অধিক মানুষ আত্মহত্যা করে নিজের জীবনকে শেষ করে দিচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। যেখানে প্রতিবছর প্রায় দশ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার জন্য যে পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে তা হলো- ফাঁসিতে ঝোলা, বিভিন্ন ওধুধ বা কীটনাশক সেবন, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, অতিরিক্ত মাদক সেবন ও ট্রেন চাপায় মারা যাওয়া ইত্যাদি। সারা বিশ্বে এ প্রবণতাগুলো প্রায় একইরকম।

গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা ‘মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ’। এছাড়াও এর আরও অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম  হলো- বেকারত্ব বাড়া, পারিবারিক অশান্তি, বিভিন্ন হতাশা বা টেনশন, প্রেমে ব্যর্থতা/পারিবারিক অস্বীকৃতি, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়া, অপমান ও অভিমান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা আর অগ্নিকাণ্ডের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। কিছুদিন আগে তারই প্রকৃত উদাহরণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সৌমিক মিত্র সবুজের আত্মহত্যা। সমাজের প্রতিটা মানুষ ভুল করে। হোক সে শিক্ষক অথবা ছাত্র। ভুল অনুযায়ী বিবেচনা করা হয় তার অপরাধটা কেমন। দেশে প্রতিটি অপরাধেরই শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু কোনও আইনেই লিখা নাই যে আত্মহত্যাই একমাত্র সমাধান। বরং আত্মহত্যা একদিকে যেমন সামাজিক ব্যাধি ধর্মীয় বিবেচনায়ও এটি নিকৃষ্ট কাজ। পৃথিবীর কোনও ধর্মই আত্মহত্যাকে সমর্থন করে না বরং আত্মহত্যাকারীর জন্য লাঞ্ছণা আর বঞ্চনার কথা উল্লেখ রয়েছে।

সৌমিক মিত্রের মিডটার্মের ফলাফল মোটেও কাম্য নয়। কাম্য না হওয়াটাই স্বাভাবিক। যেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় সেমিস্টার পরীক্ষায় বিভাগের প্রথম স্থান অধিকার করেছিল সে সেখানে এটা কিভাবে কাম্য- সে প্রশ্ন থেকেই যায়। যেখানে তৃতীয় সেমিস্টারে একটি কোর্সে ১৫ এর ১২ অপর কোর্সে ১৫ এর ৫ পেয়েছেন। যা কখনো মেনে নেওয়ার মতো না। যে ছাত্রটি প্রথম, দ্বিতীয় সেমিস্টারে বিভাগের প্রথম হয় কিন্তু তৃতীয় সেমিস্টার মিডটার্মে এসে শুধুমাত্র হাতের লেখা খারাপের কারণে সবার পেছনে পড়ে যায়- আমার মতে এটা তার অসচেতনতা আর গাফলতির ফলাফল ছাড়া আর কিছুই নয়। 

তবে হ্যাঁ, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টির সঠিক তদারকির জন্য একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দিয়েছেন ফলে আর কিছু মুহূর্ত অপেক্ষা করলে হয়ত ঢাবির গর্বিত শিক্ষক হওয়া শুধু স্বপ্নে নয় বাস্তবে রূপ দিতে পারত সৌমিক।

আবারও বলি, ‘আত্মহত্যা কোনও সমাধান নয়’; তদুপরি নিজের  জীবনকে ধ্বংস করেছেন শুধু মানসিক যন্ত্রণায় অসহ্য হয়ে। কারণ যারা আত্মহত্যা করে তারা মারা যেতে চায় না, তারা চায় জীবনযাপন বন্ধ করতে। যদি এমন পথ থাকত যে জীবন যাপন করতে হবে না এবং মৃত্যুও হবে না তাহলে তারা সে পথকেই বেছে নিত। 

জাতির ঊষার কর্ণধার আমাদের সচেতন শিক্ষক সমাজ যদি আরেকটু সচেতন হতেন তাহলে হয়ত আজ আমরা সৌমিকের মত জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাবীকে হারাতাম না। 

আসুন আমরা সবাই সচেতন হই। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও আন্তরিক ও সচেতনভাবে কাউন্সেলিং করতে হবে। সমাজে আত্মহত্যার নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজকে দায়িত্বশীল হতে হবে। শিক্ষক সমাজকে পালন করতে হবে তার যথাযথ পেশাদারিত্ব। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। সমাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির প্রতি বিশেষ সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করতে হবে। 

কেবলমাত্র তাহলেই হয়ত সৌমিকের মতো আগামীর উজ্জ্বল প্রজন্ম আলোর পথ দেখবে, অকালে ছেড়ে যাবে না সুন্দর এ পৃথিবী। বেঁচে থাকবে তাদের স্বপ্ন। সৌমিকদের মতো মেধাবীদের জাতি আর হারাতে চায় না। তারা বেঁচে থাকুক আমাদের ভালোবাসায়, বেঁচে থাকুক আমাদের আন্তরিকতায়। আর এটাই হোক আমাদের প্রত্যয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০১৯ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি