করোনা ভাইরাস: দক্ষিণ কোরিয়ায় আতঙ্কে ১৭ হাজার বাংলাদেশি

প্রবাস ডেস্ক
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ১১:২২ আপডেট: ১১:২৪

করোনা ভাইরাস: দক্ষিণ কোরিয়ায় আতঙ্কে ১৭ হাজার বাংলাদেশি

দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনা ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দেশটিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে চরম আতঙ্কে আছেন দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত প্রায় ১৭ হাজার বাংলাদেশি। প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটছে তাদের। 

সতর্কতা হিসেবে সেখানে সবাই মাস্ক পরে চলাফেরা করছে। সবার মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। রাস্তাঘাটে গাড়ি আছে, কিন্তু যাত্রী বা চালক কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছেন না। অ্যাপ দিয়ে কাজ চলছে। গত রবিবার যখন সংক্রমণের খবরটি প্রথম ছড়িয়ে পড়ে, তখন হঠাৎ করেই সবাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ক্রেতাদের চাপে শপিং মলগুলো হঠাৎ নিত্যপণ্যশূন্য হয়ে যায়। সবাই শুকনা খাবার ও ফলমূল কিনে বাড়িতে মজুদ করতে শুরু করায় এ অবস্থা তৈরি হয়।

যেসব বাংলাদেশি পরিবার নিয়ে সেখানে আছেন তারা বেশি চিন্তিত। কারণ কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো এরই মধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শিশুদের বাসায় রাখতে হচ্ছে। সংক্রমিতদের একটা বড় অংশই দেইগু শহরে, যেখানে অন্তত চার হাজার বাংলাদেশী রয়েছেন। তারা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় আছেন বলে শোনা গেছে।

দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় কোরিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশীদের সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করার জন্য বলেছেন দক্ষিণ কোরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম। সোমবার তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের ঝুঁকিতে পড়েছে কোরিয়া। শুধু কোরিয়া নয়, পুরো পৃথিবীতে হু হু করে বাড়ছে করোনা ভাইরাস। রেড অ্যালার্ট জারি করেছে কোরিয়া সরকার। করোনা শুনলেই আঁতকে উঠছে মানুষ। এ অবস্থায় তিনি প্রবাসীদের সবসময় মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে যেকোনো প্রয়োজনে দূতাবাস সার্বিক সহযোগিতা করবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন।

সংক্রমণ বাড়তে থাকায় স্থবির হয়ে আছে দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষের জনজীবন। অধিক প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে কেউ বের হচ্ছে না। দুদিন ধরে রাস্তায় মানুষজন নেই বললেই চলে। জনমানবশূন্য কোরিয়ার বাজারগুলো। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোরিয়া সরকার। অসুস্থদের জন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম, শয্যা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জাতীয়ভাবে হেল্প লাইন চালু করা হয়েছে। সবাইকে ১৩৩৯-এ কল করে সব বিষয়ে জানাতে আহ্বান জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ।

দেশটিতে ১২ সেনার শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ায় সব সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। শুধু তা-ই নয়, স্যামসাং মোবাইল ডিভাইস ফ্যাক্টরিতে এক ব্যক্তি নভেল ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে পুরো কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়।  মসজিদ, গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটির প্রশাসন।

কোরিয়ার পর্যটন বিভাগ তার দেশের নাগরিকদের ছয়টি দেশে ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে। দেশগুলো হচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান ও তাইওয়ান। আর ভিসাবিহীন ব্যক্তিদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে না বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়া রুখতে বিদেশী যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাদের মেয়াদ আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হলো।

মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনা ভাইরাস ডিজিজ বা কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা চীনে ক্রমেই কমে আসছে। আর চীনের বাইরে এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটিতে এ পর্যন্ত সংক্রমিতের সংখ্যা সপ্তাহের ব্যবধানে তিন গুণ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চীনের প্রতিবেশী দেশটি এখন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দেইগুর একটি গির্জা থেকে ভাইরাসটি এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

গতকাল পর্যন্ত ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯৩। এর মধ্যে গতকাল নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৬০ জন। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে উচ্চমাত্রায় সতর্কতা জারির পাশাপাশি দেইগুসহ অন্যান্য শহরকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে সিউল। কোরিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্যানুযায়ী, যে গির্জা থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে বলে বলা হচ্ছে, সেখানকার ৯ হাজার ৩০০ সদস্যকে কোয়ারান্টাইনে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এদিকে করোনা ভাইরাসে চীনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৬৬৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া চীনের বাইরে নিহত হয়েছে ৩৬ জন। এর মধ্যে ইরানে ১২, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৮, জাপান ৪, হংকং ২, ইটালিতে ৭, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও  ফ্রান্স ১ জন করে মোট ২ হাজার ৬৯৯ জন নিহত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিহত হয়েছে ৮০ জন। 

এ ভাইরাসে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭ হাজার ৬৫৯ জন এবং চীনের বাইরে ২ হাজার ৪৮৯ জন। সবমিলিয়ে পুরো বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ হাজার ১৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ২৭ হাজার ৫৭৮ জন সুস্থ হয়েছে। 

মঙ্গলবার সকালে চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন জানায়, চীনে নতুন করে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ৫০৯ জন এবং মারা গেছে ৭১ জন। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৭৭ হাজার ৬৫৯ জন এবং মারা গেছে ২ হাজার ৬৬৩ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৯ হাজার ২১৬ এর বেশি মানুষের অবস্থা আশঙ্কানক। এছাড়া চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। 

হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান, সেখানাকার একটি সামুদ্রিক খাদ্য ও মাংসের বাজার থেকে এই করোনা ভাইরাসটির উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।ভাইরাসটি যাতে ছড়িয়ে না যায়, সেজন্য চীন হুবেই প্রদেশকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।ওই অঞ্চলের সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে চীনসহ বাইরের বিশ্ব থেকে। 

মঙ্গলবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার ৫৭৮ জন সুস্থ হয়েছে এবং তারা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার ছাড়পত্র পেয়েছে। 

এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ আক্রান্তের খবর আসছে, তাতে আক্রান্তের আসল খবর জানা যাচ্ছে না।কারণ, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, শুধু তাদের হিসেব পরিসংখ্যানে ধরা হচ্ছে।তাই এর প্রকৃত হিসেব বের করা বা জানা খুবই কঠিন ব্যাপার, যা আরেকটি আশঙ্কার কারণ।

চীনের সবগুলো প্রদেশসহ বিশ্বের ৩৭টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। চীনের বাইরে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৪৮৯ জন শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে জাপানে ৮৫০ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৮৯৩ জন।

ভাইরাস সংক্রমণের কারণে চীন ভ্রমণে সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞা জারি এবং কড়াকড়ি আরোপ করেছে অনেক দেশ।ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশ চীন থেকে আগত যাত্রীদের ভিসা বাতিল করেছে।ভাইরাসের কারণে, বিশ্বের অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।চীনে অধিকাংশ বিমান সংস্থার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্সসহ আরও অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

এছাড়া, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে (কোভিড-১৯) চীনে ৮ স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চীনে ৩ হাজার  স্বাস্থ্যকর্মী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। রবিবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এ তথ্য জানিয়েছেন। 

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের সহকারী পরিচালক জেং ইজিন জানান, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে এরইমধ্যে ৮ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া ৩ হাজার জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। যা ভাইরাসটিতে মোট আক্রান্ত রোগীদের ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে হুবেই প্রদেশে রয়েছে ২ হাজার ৫০২।

গত ডিসেম্বরে চীনে উদ্ভূত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা।এখন পর্যন্ত চীনের বাইরে বিশ্বের ৩৭টি দেশে ২ হাজার ৪৮৯ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। শুধু চীনেই আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭ হাজার ৬৫৯ জন।

যেসব দেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে-

চীন- ৭৭ হাজার ৬৫৯ জন, দক্ষিণ কোরিয়া- ৮৯৩, জাপান- ৮৫০,  ইটালি- ২২৯, সিঙ্গাপুর- ৯০, হংকং- ৮১, ইরান- ৬১, যুক্তরাষ্ট্র- ৫৩, থাইল্যান্ড- ৩৫,  তাইওয়ান- ৩০, অস্ট্রেলিয়া- ২২, মালয়েশিয়া- ২২, জার্মানি- ১৬, ভিয়েতনাম- ১৬, যুক্তরাজ্য- ১৩, আরব আমিরাত- ১৩, ফ্রান্স- ১২, কানাডা- ১১, ম্যাকাও- ১০, কুয়েত- ৫, ফিলিপাইন- ৩, ভারত- ৩, স্পেন- ৩, বাহরাইন-২, ইজরাইল- ২, ওমান- ২, রাশিয়া- ২, আফগানিস্তান-১, বেলজিয়াম- ১, কম্বোডিয়া- ১, মিশর- ১, ফিনল্যান্ড- ১, ইরাক- ১, লেবানন- ১, নেপাল- ১, শ্রীলঙ্কা- ১ ও সুইডেন- ১ জন।

ব্রেকিংনিউজ/এম

breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি